মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে আজ রোববার বিকেলে কুয়ালালামপুরে পৌঁছাবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মালয়েশিয়া সফর শেষ করে তিনি সোমবার চীনগামী হবেন। বিশেষজ্ঞরা বলেন, গত সরকারের পরিবর্তনের পর নতুন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বাংলাদেশের এই দুই দেশ ভ্রমণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ; সেখানে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের নতুন দ্বার উন্মোচনের সম্ভাবনা আছে।
মালয়েশিয়ার দুদিনের সফরে প্রধান আলোচ্য হবে শ্রমবাজার, আসিয়ানে যোগদান এবং রোহিঙ্গা সমস্যাসহ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দুদেশের মধ্যে অন্তত দুই ডজন সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ও বিভিন্ন চুক্তি সইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। পররাষ্ট্র বিষয়ক কর্মকর্তারা শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে বলেও জানান।
২২ জুন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ারের সঙ্গে তারেক রহমানের একান্ত বৈঠকের পর দুই দেশের কর্মকর্তা পর্যায়ে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, জ্বালানি সহযোগিতা, হালাল অর্থনীতি, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, কৃষি, শিক্ষা ও জনযোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা হবে। শেখানো হবে কীভাবে দুই দেশ আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে পারে এবং ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়াতে পারস্পরিক সহায়তার সুযোগ কী আছে।
পররাষ্ট্রসচিব জানান, মালয়েশিয়ার সঙ্গে শ্রমবাজার পুনরায় চালু করা, বাংলাদেশি কর্মীদের নিয়োগপ্রক্রিয়া স্বচ্ছ করা এবং প্রবাসী কল্যাণের বিষয়গুলো আলোচ্য তালিকায় থাকবে। একই সঙ্গে মালয়েশিয়াকে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে সমর্থন এবং আসিয়ানের সদস্যপদ প্রক্রিয়ায় সহায়তা কামনা করা হবে। সাংস্কৃতিক বিনিময় ও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে দুদেশের মধ্যে আলোচনার সম্ভাবনাও রয়েছে।
মালয়েশিয়ায় বর্তমানে প্রায় আট লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করেন এবং প্রায় ১২ হাজার বাংলাদেশি ছাত্র-ছাত্রী পড়াশোনা করছেন। তবে ২০২৪ সালের ১ জুন থেকে নিয়োগপদ্ধতি নিয়ে অভিযোগ থাকায় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশিদের জন্য সাময়িকভাবে বন্ধ ছিল। এই পটভূমিতেই শ্রমবাজার পুনরায় খোলার বিষয়টি উচ্চ গুরুত্ব পেয়েছে।
কুয়ালালামপুরে এসে প্রধানমন্ত্রী সাংগ্রিলা হোটেলে থাকবেন। ২২ জুন সকালে তিনি পুত্রজায়ায় (পেরদানা পুত্র) প্রধান প্রশাসনিক ভবন পরিদর্শন করবেন; সেখানে দুই দেশের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলন ও আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমে অংশ নেবেন।
মালয়েশিয়া সফর শেষে ২২ জুন বিকালেই তিনি বিমানে চীনগামী হবেন। চীনের চার দিনের সফরে দুটি তথ্য সূত্রে উল্লেখ আছে—একদিকে বলা হচ্ছে ১৬টি সমঝোতা স্মারক ও ৩টি চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা, অন্যদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রধানের হিসেবে প্রায় ১৫-১৭টি সমঝোতা স্মারক বা চুক্তি অনুস্মারক হতে পারে; এগুলোর মধ্যে কিছুর ধরনকে কার্যক্রম-চুক্তি ও প্রটোকল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তথ্যানুযায়ী এসব চুক্তি বেল্ট অ্যান্ড রোড, বিনিয়োগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রপ্তানি সম্প্রসারণ, মুক্ত বাণিজ্য, জ্বালানি খাত ও মোংলা বন্দর সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক উদ্যোগকে আংশিক আচ্ছাদন করবে।
চীনে ঐতিহাসিক ও কূটনৈতিক অগ্রাধিকারভিত্তিক কয়েকটি বিষয়ও চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে—তবে পররাষ্ট্রসচিব জানিয়েছেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা থাকলেও সফরে তিস্তা নিয়ে কোনো সমঝোতা স্মারক সই হবে না। চীনের রাষ্ট্রসংস্থা শিনহুয়া ও চায়না মিডিয়া গ্রুপের সঙ্গে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সইয়ের কথাও রয়েছে।
আলোচনায় আরও আছে মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন, যৌথ মানবসম্পদ উন্নয়ন, বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন। চীনের সঙ্গে ব্যবসা-বিনিয়োগ ও অবকাঠামো প্রকল্পে নতুন অর্থায়ন ও অংশীদারিত্বের সুযোগ তৈরির প্রত্যাশা রয়েছে।
চীনের লিয়াওনিং প্রদেশের দালিয়ানে পৌঁছে তিনি সেখানে সাংগ্রিলা হোটেলে থাকবেন এবং ২৩ জুন ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ঊর্ধ্বতন প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। তিনি সামার-দাভোসের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করবেন এবং বেইজিংয়ে রাষ্ট্রীয় আমন্ত্রণমূলক অনুষ্ঠান ও উচ্চস্তরের বৈঠকে যোগ দেবেন—এর মধ্যে রয়েছে ডায়াওউতাই হোটেলে ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম, গ্রেট হল অব দ্য পিপলে অভ্যর্থনা এবং চীনা প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে বৈঠকের সম্ভাব্যতা। সফরের শেষ দিনে তিনি পিপলস হিরোজ স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও চীনের সংসদের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
বহুজাতিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, মালয়েশিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও মজবুত হলে বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগ প্রবাহ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা বাড়বে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেনসহ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ বলেছেন, এই সফরের সময় বলা-বলার মধ্যে তফাত থাকা স্বাভাবিক, তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে কূটনীতিতে ভারসাম্য বজায় রাখা এবং বড় শক্তিগুলোর উদ্বেগের বিষয় না সৃষ্টি করা।
প্রধানমন্ত্রী সফরে ২৭-২৮ সদস্যের একটি ছোট প্রতিনিধি দল নিয়ে যাচ্ছেন। দলের মধ্যে আছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনসহ আরও কয়েকজন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম সফরের সূচি ও লক্ষ্য বিস্তারিত তুলে ধরেন।
সরকার গঠনের পর এটি প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশি সফর। মালয়েশিয়া ও চীনে এই সফরের মাধ্যমে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরো গভীর ও বহুমাত্রিক হবে—এটাই সরকারি পক্ষ ও বিভিন্ন কূটনৈতিক বিশ্লেষকের আশাবাদ। প্রধানমন্ত্রীর নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী তিনি ২৬ জুন দেশে ফেরার কথা জানিয়েছেন।








