ঢাকা | রবিবার | ১২ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৯শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | ২৪শে শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

আইএমএফ: ইরান সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি

ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ধীর করার আশঙ্কা বাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা সতর্ক করে জানিয়েছেন, এই সংঘাতের কারণে আগের তুলনায় অর্থনৈতিক পূর্বাভাস কমিয়ে আনা হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি দ্রুত পুনরুদ্ধার করতে পারবে না। এই তথ্য জানায় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এপি ও দ্য গার্ডিয়ান।

আগামী সপ্তাহে ওয়াশিংটনে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বৈঠকের পূর্বাভাসে জর্জিয়েভা বলেন, ‘যদি এই যুদ্ধ শুরু না হতো, আমরা বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি আরও অনেক বেশি করে অনুমান করতে পারতাম। কিন্তু বর্তমান অবস্থায় এমনকি আমাদের সবচেয়ে আশাবাদী পরিকল্পনাতেও প্রবৃদ্ধির হার কমিয়ে ধরতে হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ফেব্রুয়ারি ২৮ থেকে চলমান সংঘাত বিশ্ব অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ বদলে দিয়েছে এবং এতে মানুষের জীবনযাত্রার মান সম্পর্কে স্থায়ী ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

জর্জিয়েভা জানিয়েছেন, সংঘাতের কারণে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তেল শোধনাগার, ট্যাংকার টার্মিনালসহ গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে কৃষিক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সার ও ইনপুটসের সরবরাহেও বিভ্রাট দেখা দিয়েছে, যা খাদ্য-মূল্য ও উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এসব কারণে ব্যবসা ও ভোক্তাদের আস্থা কমছে এবং অর্থনীতির স্বাভাবিক স্রোত বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান শর্তসাপেক্ষভাবে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছিল। তবে জর্জিয়েভা বলেন, যদিও শান্তিচুক্তি স্থায়ী হতে পারে, তবুও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ক্ষতি দ্রুত পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে না। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে পণ্যের পরিবহন ও হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনে কতটা সময় লাগবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

সংঘাত নিয়ে অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আবারও বাড়তে শুরু করেছে, যা বৈশ্বিক অস্থিরতার ইঙ্গিত বহন করে। জর্জিয়েভা সতর্ক করে বলেন যে আমদানিনির্ভর দেশ এবং দরিদ্র দ্বীপদেশগুলো এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হবে। অনেক দেশের ঋণের বোঝা বেশি থাকায় তারা কর কমানো বা ব্যয় বাড়ানোর মতো জরুরি নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে সীমাবদ্ধ হবে।

নীতিনির্ধারকদের প্রতি তিনি বিশেষ ধরনের সাবধানতার আহ্বান জানিয়ে বলেন, কোনো দেশ যেন একপাক্ষিকভাবে রফতানি বন্ধ করে বা কঠোর মূল্য নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে—একে তিনি ‘আগুনে পেট্রল ঢালার’ সঙ্গে তুলনা করেছেন। বরং সীমিত সম্পদ এনে সবচেয়ে অসহায় পরিবারের ওপর লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা বাড়ানো উচিত, যাতে সামাজিক প্রতিকূলতা কমানো যায়।

ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর অ্যান্ড্রু বেইলিও এই সংঘাতকে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আইএমএফ পূর্বে ২০২৬ সালের জন্য ৩.১ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস জানিয়েছিল; তবে আগামী মঙ্গলবার প্রকাশিত প্রতিবেদনিতে তা আরও কমিয়ে আনা হবে বলে নির্দেশনা রয়েছে।

সংক্ষেপে, যুদ্ধপ্রধান এই সংকট শান্ত হলে সাময়িক স্বস্তি মিলতে পারে, কিন্তু এর অর্থনৈতিক অভিঘাত দীর্ঘসময় ধরে থাকবে। মূল্যস্ফীতি, সরবরাহশৃঙ্খলে বিঘ্ন ও উন্নয়নশীল দেশের ঋণগত দুর্বলতা মিলিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে সঠিক নীতি ও আন্তর্জাতিক সমন্বয়ই ক্ষতি সীমিত করার একমাত্র পথ বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।