বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জ্বালানিতে এবার আরও এক ভয়াবহ যোগ—‘এল নিনো’। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বজুড়ে গত কয়েক দিনের তীব্র তাপপ্রবাহের সাথে এই ঘটনা যোগ হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। এশিয়া থেকে ইউরোপ পর্যন্ত মানুষ এখনই উষ্ণতার এই চরম রূপ অনুভব করতে শুরু করেছে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা অনুযায়ী, এল নিনো ফিরলে একদিকে পারদ অস্বাভাবিকভাবে চড়বে, অন্যদিকে কিছু জায়গায় রেকর্ডভঙ্গী বন্যা ও খরা দেখা দিতে পারে। ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন ভুক্ত বিজ্ঞানীরা বলছেন, একটি স্থায়ী উচ্চচাপ বলয়ের কারণে ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, স্পেন ও দক্ষিণ ইংল্যান্ডে তাপমাত্রা স্বাভাবিক মৌসুমি গড়ের তুলনায় ৫–১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি উঠেছে। কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিসের বিশ্লেষণ বলছে, ইউরোপের গতি বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় দ্বিগুণ দ্রুত।
ইউরোপের ৮৫০টির মতো বড় শহরের প্রায় অর্ধেকই ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী ‘হিট স্ট্রেসে’ আছে—শরীর ঘামিয়ে তাপ কেটে না যাওয়ায় স্বাস্থ্যঝুঁকি তীব্র হচ্ছে। বেশকিছু দেশে হাসপাতালে রোগীর চাপ বেড়ে এবং বাড়িতে আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনা বাড়ছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে অনেক কনসার্ট, ম্যারাথন ও গণজমায়েত বাতিল করা হয়েছে।
স্পেনে মোমো মনিটরিং সিস্টেমের হিসাব অনুযায়ী দাবদাহে অন্তত ৩২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। বার্সেলোনার কাছে একটি বনে বড় আগুনে প্রায় ১৬ হাজার মানুষকে আশ্রয় নিতে বাধ্য করা হয়েছিল। ফ্রান্সে তাপপ্রবাহের কারণে হাসপাতালগুলো জরুরি পরিকল্পনা চালু করেছে; তপ্ত গাড়ির ভেতরে কয়েক শিশুর মৃত্যু ঘটেছে এবং অনিরাপদ এলাকায় সাঁতার কাটতে গিয়ে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫৫ জন ডুবে মারা গেছে।
জার্মানির দক্ষিণ-পশ্চিম শহর সারব্রুকেনে রেকর্ড ৪১.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস নথিভুক্ত করা হয়েছে। নেদারল্যান্ডসের লিমবার্গে সর্বোচ্চ ৩৯.৪ ডিগ্রি, যুক্তরাজ্যের সাফোকের ক্যাভেনডিশে ৩৭.১ ডিগ্রি রেকর্ড করা হয়েছে। গত শুক্রবার অন্তত ১৫ কোটি ইউরোপীয়ন ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের অধিক তাপের মুখোমুখি হয়েছিল।
চেক ও অস্ট্রিয়ার আবহাওয়াবিদরা বলছেন, চলমান ঢেউ আগামী দিনগুলোয় আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং কিছু স্থানে পুরনো রেকর্ড ভাঙা সম্ভব। বলকান অঞ্চলেও তীব্র গরম দেখা যাচ্ছে—সার্বিয়ায় সপ্তাহান্তে ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপ বাড়ার পূর্বাভাস এসেছে।
তীব্র গরম বিদ্যুৎ ও অবকাঠামোতেও প্রভাব ফেলেছে। সুইজারল্যান্ডের বেজনউ পারমাণবিক কেন্দ্রের দুইটি রিয়্যাক্টর নদীর পানির তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি ছুঁয়েছে বলে বন্ধ করতে হয়েছে, কারণ এত উষ্ণ পানি রিয়্যাক্টর ঠাণ্ডা করার উপযোগী নয়।
ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন (ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশনের বিজ্ঞানীরা) ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই তাপপ্রবাহের পেছনে একটি স্থায়ী উচ্চচাপ বলয় ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চ তাপমাত্রা কাজ করছে। এরই মধ্যে একটি ইউরোস্টার ট্রেন কোলন থেকে প্যারিসগামী পথে ব্রাসেলসের কাছে প্রায় ৪০০ যাত্রী নিয়ে বিকল হয়ে পড়ে; তাপের কারণে অসুস্থ হন কয়েকজন, তিনজনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
সুইস হিমবাহ গবেষকরা সতর্ক করেছেন, এই গরমে হিমবাহ গলতে শুরু করেছে—যা সাধারণত আগস্টে দেখা যায়—এবং গত ২০২২ সালের পর এ গলনির গতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। অন্যদিকে, বিশ্বজুড়ে কিছু অংশে ভারী বৃষ্টি ও ঝড় নেমে এসেছে—জাপানে ভারী বর্ষণ ও ঝড়, ব্রাজিলে বন্যার আশঙ্কা—এল নিনোর এক বৈশিষ্ট্যই হলো ‘কোথাও খরা, কোথাও বন্যা’।
ডব্লিউএমও বলছে, আগামী আগস্টের মধ্যে এল নিনো সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৮০ শতাংশ এবং নভেম্বরের মধ্যে এটি পূর্ণ শক্তিতে ওঠার সম্ভাবনা প্রায় ৯০ শতাংশ। এর ফলে পরবর্তী তিন-ছয় মাসে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে অস্বাভাবিক তাপমাত্রা ও চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়বে।
জাতিসংঘ ও বৈশ্বিক নেতারা তৎপরতার আহ্বান জানাচ্ছেন। ডব্লিউএমওর মুখপাত্রদের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনে সৃষ্ট এই চরমতার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেওয়া হবে না—প্রস্তুতি ছাড়া বিপদ অনেক বড় হবে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলছেন, এল নিনো বর্তমান বিশ্বকে আরও তীব্র রিস্কের মুখে ধাক্কা দিচ্ছে এবং তার প্রতিরোধে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত কমানো ছাড়া বিকল্প নেই।
বিশ্বনেতাদের দৃষ্টি এখন জরুরি প্রস্তুতি, ভ্যাকসিন ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার শক্তকরণ, বিদ্যুৎ-জল অবকাঠামো রক্ষাসহ নিকটস্থ জনস্বাস্থ্য প্রোটোকল জোরদার করার দিকে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য শক্তি ও সবুজ রূপান্তর দ্রুততর করারও আহ্বান শোনা যাচ্ছে—তাতে কেবল ভবিষ্যৎ ঝুঁকি কমবে না, বর্তমান প্রভাব সামালদেও সুবিধা হবে।
সংক্ষেপে, ইউরোপে চলমান দাবদাহ এখনই থেমে যাচ্ছে না; এল নিনো যদি সক্রিয় হয়, তাহলে এটি বিশ্বব্যাপী তাপ ও আবহাওয়ার চরমতার মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। কর্তৃপক্ষ ও নাগরিকদের জন্য এখনই সতর্কতা, প্রস্তুতি ও দূরদর্শী পরিকল্পনা জরুরি।








