মাউন্ট এভারেস্ট এখন আর শুধু পর্বতারোহীদের গন্তব্যই নয়—এটি হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার নতুন মঞ্চ। ড্রোন নিয়েও দুই পরাশক্তির টানাপোড়েনে নেপাল নাজুক সমীকরণে আটকে আছে।
গত ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিনিধি দল হেলিকপ্টার করে এভারেস্ট বেসক্যাম্পে পৌঁছান। দলটির নেতৃত্বে ছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোর। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫ হাজার ৩৬৪ মিটার উচ্চতায় থাকা বেসক্যাম্প থেকে পর্বতারোহীরা তাদের অভিযান শুরু করেন।
আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, মার্কিন দল সেখানে তাদের আল্টা এক্স জেন ২ ড্রোনের সক্ষমতা পরীক্ষা করতে চেয়েছিল। পরিকল্পনা করা হয়েছিল—অক্সিজেন সিলিন্ডার, মই, অন্যান্য পর্বতারোহণ সরঞ্জাম ও খাদ্যদ্রব্য বেসক্যাম্প থেকে ওপরে ক্যাম্প-ওয়ানে (৬ হাজার ১৩০ মিটার উচ্চতায়) পৌঁছে দেয়া। তবে একই কাজ চীনের তৈরি ডিজেআই ফ্লাইকার্ট ৩০ ড্রোন ২০২৪ সাল থেকে কার্যকরভাবে করছে।
মার্কিন দলের পরীক্ষার জন্য নেপালের স্থানীয় অভিযাত্রী সংস্থা সেভেন সামিট ট্রেক ও স্থানীয় ড্রোনচালককেও ডেকে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু বেসক্যাম্পে পৌঁছানোর পরই জটিলতা দেখা দেয়। নেপালের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিরাপত্তা এবং ড্রোন পরিচালনার সংবেদনশীলতার কারণে মার্কিন প্রতিনিধিদলকে ড্রোন উড়াতে অনুমতি দেয়নি। ফলে আল্টা এক্স জেন ২ ড্রোনটি এভারেস্ট এলাকায় উড়ানো সম্ভব হয়নি এবং মার্কিন কর্মকর্তারা পরে কাঠমান্ডু ফিরে যান।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ঘটনাই ছোট করে দেখিয়েছে কিভাবে প্রযুক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেপালকে এক ঝুঁকিপূর্ণ সামঞ্জস্য রাখার অবস্থায় ফেলেছে।
চীনের উপস্থিতি আলাদা দিক থেকে দৃশ্যমান। হিমালয়ের ওপারে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে চীন এভারেস্টে ড্রোন ব্যবহার করে সরঞ্জাম পরিবহনে অনেকটাই এগিয়ে। ২০২৪ সালে প্রথমবার ডিজেআই ফ্লাইকার্ট ৩০ ড্রোন ব্যবহার করে ক্যাম্প-ওয়ানে সরবরাহ সফলভাবে করা হয়। সফলতার পর চীনা প্রতিষ্ঠান ডিজেআই নেপালের এয়ারলিফট টেকনোলজিকে দুটি ড্রোন হস্তান্তর করে।
এ বছর ডিজেআই তাদের সর্বশেষ সংস্করণ ফ্লাইকার্ট ১০০ আনুষ্ঠানিকভাবে বাজারে ছাড়ার আগেই নেপালে সরবরাহ করে দিয়েছে বলে জানানো হয়। ড্রোন অপারেটরদের দাবি, এই ড্রোন তিন মিনিটেরও কম সময়ে ৪৫ কেজি পর্যন্ত মালামাল ক্যাম্প-ওয়ানে পৌঁছে দিতে পারে। এয়ারলিফট টেকনোলজির পরিচালক মিলন পান্ডে আল জাজিরাকে জানিয়েছিলেন, ‘ড্রোনটি আট মিনিটের মধ্যে মালামাল পৌঁছে দিয়ে আবার বর্জ্য নিয়ে বেসক্যাম্পে ফিরে আসতে পারে, যেখানে একজন শেরপার ওই কাজ করতে ছয় থেকে সাত ঘণ্টা সময় নেয়।’
সংস্থাটির দাবি, ড্রোনগুলো কয়েক মিনিটে অন্তত ১০টি অক্সিজেন সিলিন্ডার ক্যাম্প-ওয়ানে পৌঁছে দিতে সক্ষম; একই কাজ তিনজন শেরপার সারাদিন খরচ করে। বর্তমানে ড্রোনগুলোর মাধ্যমে দৈনিক গড় ৯০০ কেজিরও বেশি মালামাল পরিবহন হচ্ছে বলে বলা হয়।
শুধু সুবিধাই নয়, ড্রোন ব্যবহারের ফলে বিপজ্জনক বরফঢাকা পথে শেরপারদের ঝুঁকি ও শ্রম অনেকটাই কমেছে। তবু এবছর মৌসুমের অফিসিয়াল শুরুর আগেই পাঁচজন শেরপারের মৃত্যুর খবর এসেছে, যা স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক ভাবে উদ্বেগের কারণ।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা সতর্ক করেন যে অর্থনৈতিক সহায়তা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার আড়ালে চীন, যুক্তরাষ্ট্র এমনকি ভারতও নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে পারে। নেপালের সাবেক সেনা কর্মকর্তা বিনোজ বসনিয়াত বলেন, ‘আমরা অনেক সময় প্রযুক্তি যাচাই না করেই সহায়তা গ্রহণ করি। এসব প্রযুক্তি নজরদারির কাজে ব্যবহারেও আসতে পারে।’
এসব রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে এবরেস্ট সিজনে নেপাল সরকার নিরুৎসাহী নীতিও দেখিয়েছে। মার্কিন প্রতিনিধিদলকে অনুমতি না দিয়ে রাখার পর কর্তৃপক্ষ এক সপ্তাহের জন্য চীনের ডিজেআই ফ্লাইকার্ট ১০০ ড্রোনের অনুমতিও স্থগিত করে। এতে সরঞ্জাম পরিবহন ও রশি স্থাপনের কাজ কিছুটা ব্যাহত হয় বলে আড়ভুক্ত এয়ারলিফট টেকনোলজি জানিয়েছিল। পরে ৯ মে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলে চীনা ড্রোন পুনরায় কাজ শুরু করে। তবে মার্কিন আল্টা এক্স জেন ২ ড্রোনটি এখনও বেসক্যাম্পেই রাখা আছে।
এখন প্রশ্নটা বড়: প্রযুক্তি সুবিধা দ্রুতই ভূ-রাজনীতি ও সুরক্ষা সংক্রান্ত উদ্বেগের সঙ্গে জড়িয়েছে। সীমাবদ্ধ সম্পদ ও ভৌগোলিক দায়বদ্ধতায় নেপালকে দুই পরাশক্তির মধ্যে সতর্কভাবে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে—সেবা পাওয়া এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা, উভয়টাই প্রয়োজনে সমান গুরুত্ব পাবে।








