কোরবানির ঈদ এখন শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়—বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির একটি বড় অধ্যায়। নীতিনির্ধাকারী ও ব্যবসায়ী নেতাদের প্রাক্কলন অনুযায়ী ২০২৬ সালের এই ঈদে পশু-সহ আনুষাঙ্গিক খাত মিলিয়ে প্রায় সাড়ে তিন লাখ কোটি থেকে চার লাখ কোটি টাকার বাণিজ্য হতে পারে।
ঈদের এই ব্যাপক অর্থনৈতিক গতিবিধির বড় অংশ সরাসরি গ্রামীণ অর্থনীতিতে পৌঁছে যায়। লাখো ক্ষুদ্র খামারি ওপরিবার এই সময়ে প্রধান আয়ের উৎস পান। সরকারি ও বেসরকারি হিসাব অনুযায়ী এবার দেশে প্রায় ১ কোটি ২৩ লাখেরও বেশি পশু প্রস্তুত রয়েছে, যেখানে সম্ভাব্য চাহিদা প্রায় ১ কোটি ১১ লাখ। যদি প্রতিটি পশুর গড় বিক্রয়মূল্য ৭০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা ধরা হয়, তাহলে শুধুমাত্র পশু কেনাবেচাতেই এক লাখ কোটি টাকার বেশি লেনদেন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পশুর বাজার ঘিরে পশুখাদ্য, ওষুধ, টিকা ও খামার সরঞ্জামের ব্যবসাও তেজী হয়েছে। পশুর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, মাংস সংরক্ষণ ও পরিবহনের চাহিদা বাড়ায় রেফ্রিজারেটর ও ডিপ ফ্রিজের বাজারেও বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে—যার প্রভাব ইলেকট্রনিক্স খাতেও পড়েছে। অনেক কোম্পানি কিস্তি সুবিধা ও বিশেষ অফার চালু করেছে, যাতে ক্রেতারা সেই সুবিধা নিতে পারে।
কোরবানির চাহিদা পোশাক, কসমেটিকস ও ফ্যাশন শিল্পকেও সরাসরি উত্তেজিত করে। ধারণা করা হচ্ছে, একমাত্র এই ঈদেই ফ্যাশন ও ব্যক্তিগত ব্যবহার্য পণ্যে প্রায় ৮০ হাজার থেকে এক লাখ কোটি টাকার লেনদেন হতে পারে। একই সঙ্গে দেশের পরিবহন খাত অতিরিক্ত চাপ ও আয় পাচ্ছে। উত্তরবঙ্গসহ নানা জেলায় থেকে রাজধানী ও বড় শহরে পশু পরিবহনে হাজার হাজার ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান ব্যবহার হচ্ছে, যা চালক ও শ্রমিকদের জন্য মৌসুমি আয় বাড়াচ্ছে।
ভৌগোলিকভাবে মোট বাণিজ্যের প্রায় ৩০–৩৫ শতাংশই ঢাকায় কেন্দ্রীভূত হয়; বিশ্লেষকরা বলছেন, এতে ঢাকার অংশপ্রাপ্তি আনুমানিক ১ লাখ কোটি থেকে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে পড়তে পারে।
ক্ষুদ্র ও অনানুষ্ঠানিক খাতগুলোও এই সময়ে চমক দেখায়। ছুরি, দা, চাপাতি, বঁটি তৈরি করা কামারশালা, চাটাই ও অন্যান্য সরঞ্জাম প্রস্তুতকারীরা বছরের সবচেয়ে ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করেন—যা হাজার হাজার নিম্ন আয়ের মানুষের মৌসুমি কর্মসংস্থানের বড় উৎস।
একই সঙ্গে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও মোবাইল আর্থিক সেবার ব্যবহার কোরবানির ব্যবসাকে আরও সুসংগঠিত করে তুলেছে। অনলাইন পশুর হাট, মোবাইল পেমেন্ট ও লজিস্টিক সেবা ক্রেতা-বিক্রেতাদের যোগাযোগকে সহজ করেছে এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক লেনদেনকে আংশিকভাবে আনুষ্ঠানিক করেছে।
তবুও সবখানেই ইতিবাচক চিত্র নেই—চামড়া শিল্প এখনো প্রমুখ সমস্যায় জর্জরিত। দুর্বল সংরক্ষণ পদ্ধতি, মানসম্মত ট্যানারি সুবিধার অভাব ও রপ্তানি চাহিদার অসামঞ্জস্যের কারণে চামড়া থেকে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিকীকরণ ও সরবরাহ চেইন ও মান নিয়ন্ত্রণ করলে চামড়া খাত ভবিষ্যতে বড় রপ্তানি আয় জোগাতে পারে।
মোটকথা, ঈদুল আজহার সময় গ্রামীণ আয়ের প্রবাহ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কর্মপরিসর, মৌসুমি কর্মসংস্থান ও সংশ্লিষ্ট শিল্প উৎপাদনের সেতুবন্ধনের কারণে দেশের অর্থনীতি একটি সামষ্টিক শক্তি পায়। সঠিক নীতি ও অবকাঠামো হলে এই মৌসুমীয় বাণিজ্য দেশের টেকশই উন্নয়নে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।







