ঢাকা | বৃহস্পতিবার | ১১ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৮শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২৫শে জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

কোরবানি ঈদে প্রেক্ষাগৃহে দর্শকখরা; পাইরেসির ধাক্কায় ‘রকস্টার’

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পে বরাবরের মত ঈদ মানেই ছবি মুক্তি ও প্রেক্ষাগৃহে ভিড়; ব্যবসাও জমে ওঠে। গত几年 ধরে ঈদের সিনেমাগুলো প্রায় এক মাস বা তার বেশি সময় ধরে হলে টিকেই থাকতো। কিন্তু এবারের কোরবানি ঈদ সেই ধারাকে ভেঙে দিয়েছে—মুক্তির দুই সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগেই হলগুলোর মধ্যে তীব্র দর্শকশূন্যতা দেখা গেছে।

বড় প্রত্যাশা ও ব্যাপক প্রচারণার মধ্যেও একে একে মুক্তি পাওয়া আটটি ছবি—শাকিব খানের ‘রকস্টার’, মেজবাউর রহমান সুমনের ‘রইদ’, আরিফিন শুভর ‘মালিক’, সৈকত নাসিরের ‘মাসুদ রানা’-সহ—কোনোটিই বক্স অফিসে কাঙ্ক্ষিত সাড়া তুলতে পারেনি। ফলে ঈদের তৎকালীন আমেজ দ্রুত ম্লান হচ্ছে; এতে বিনিয়োগকারী ও হল-মালিকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।

রুশভ মাল্টিপ্লেক্স স্টার সিনেপ্লেক্স ও যমুনা ব্লকবাস্টারের মতো বড় শো-হলগুলো সাধারণত ঈদে দেশি ছবির জন্যই হলগুলো পূর্ণ রাখে এবং বিদেশি ছবি কম দেখানো হতো। কিন্তু এবারে দর্শক উপস্থিতি এতটাই কমে গেছে যে সিনেপ্লেক্সগুলো আবার বিদেশি ছবি—যেমন ‘মাইকেল’ ও ‘সিকিন নাইন’—প্রদর্শন শুরু করেছে। প্রেক্ষাগৃহ মালিকরা বলছেন, গত কয়েক বছরের ধারাবাহিক সাফল্য এবার বড় আঘাত খেয়েছে।

স্টার সিনেপ্লেক্সের বিপণন ব্যবস্থাপক মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ জানান, কোনো সিনেমাই তাদের প্রত্যাশিত ব্যবসায়িক লক্ষ্য ছুঁয়েছে না। ‘‘কয়েকটি ছবিই মাঝেমধ্যে কিছু দর্শক টেনে আনছে, কিন্তু তা হলে-ভর্তি সামর্থ্যের তুলনায় খুবই নগণ্য,’’ তিনি বললেন। চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সভাপতি আওলাদ হোসেন উজ্জ্বলও হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, সিঙ্গেল স্ক্রিনগুলোতেও দর্শক টানতে ব্যর্থ হয়েছে বর্তমান ছবিগুলো; এমনকি শাকিব খানের ছবির আগের মতো গণউন্মাদনা মাঠ পর্যায়ে দেখা যায়নি।

অর্থনৈতিক ক্ষতির ওপর আরেকটি বড় ধাক্কা এসেছে পাইরেসির মাধ্যমে। শাকিব খানের ‘রকস্টার’ মুক্তির মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই অনলাইনে ফাঁস হয়ে যায়—বিভিন্ন টেলিগ্রাম চ্যানেল ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবিটির ভিডিও লিংক ছড়িয়ে পড়ে। প্রেক্ষাগৃহের আয় এতে বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়েছে বলে পরিবেশকরা মনে করছেন। আগের বারের মতো ‘বরবাদ’ ও ‘তাণ্ডব’ ছবির ক্ষেত্রেও পাইরেসি ঘটেছিল, কিন্তু তখন প্রো-নালিশন বা শক্তিশালী হাইপ থাকায় বাণিজ্যিক ক্ষতি সামান্যই ছিল; ‘রকস্টার’-এর ক্ষেত্রে তা অনেক বেশি গুরুতর বলে দাবি করা হচ্ছে।

সিনেমা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোরবানি ঈদে দর্শকরা গল্পের মান ও সমসাময়িকতার দিকে বেশি নজর দেয়; কিন্তু এবার বেশ কয়েকটি ছবির চিত্রনাট্য দুর্বল ছিল এবং দর্শকের রুচির সঙ্গে মানানসই হয়নি—এটাই ব্যর্থতার বড় একটি কারণ। রোজার ঈদে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ দীর্ঘ সময় ধরে হলে দাপট দেখিয়েছিল; একই রকম টেকসই সফলতা কোরবানির ছবিগুলোতে দেখা গেল না, যা পুরো ইন্ডাস্ট্রির ওপর আর্থিক চাপ বাড়িয়ে দিয়েছে।

চলচ্চিত্রবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দর্শক ফিরিয়ে আনার জন্য আর কোনো বিকল্প নেই—ভালো চিত্রনাট্য, মানসম্মত নির্মাণ ও আধুনিক গল্পের উপর জোর দিতে হবে। পাশাপাশি পাইরেসি প্রতিরোধে কড়া ব্যবস্থা নেয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, কেননা মুক্তি-পরবর্তী অনলাইন লিক হলে যে ক্ষতি হয় তা সহজে পুনরুদ্ধার করা কঠিন। বিনিয়োগকারীরা ও হল-মালিকরাও আশা করছেন, ভবিষ্যতে দর্শকসম্পন্ন ও গুণগত গল্পবান চলচ্চিত্র প্রযোজনা হলে ধীরে ধীরে প্রেক্ষাগৃহে প্রাণ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।