গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিটির সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী জানিয়েছেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই গুমের ঘটনা সংঘটিত হয়। গুমের শিকার ব্যক্তিদের চার ধরনের সম্ভাব্য পরিণতি দেখা গেছে। গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর গুলশানে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব তথ্য প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, গুমের শিকার ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে মূলত চার ধরনের পরিণতি ঘটেছে। প্রথমত, অনেককেই হত্যা করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, বিচার অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই মিডিয়ায় উপস্থাপন করে তাদের জঙ্গি হিসেবে আরোপণ করা হয়েছে এবং দেশের ভেতরেই নতুন ফৌজদারি মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। তৃতীয়ত, কিছু ক্ষেত্রে সীমান্ত পার করে ভারতে পাঠিয়ে সেখানে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে গ্রেফতার করানো হয়েছে। সর্বশেষ, অত্যন্ত কিছুকিছু ক্ষেত্রে মামলাবিনা তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, যা ভাগ্য ভাল থাকাকে নির্দেশ করে।
গুম কমিশনের দ্বিতীয় অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেয়ার পর আজ দুপুরে গুলশানে শিল্পনগরী কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান মইনুল ইসলাম চৌধুরী।
তিনি আরও বলেন, পূর্বের কর্তৃত্ববাদী সরকারের আমলে বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের পদ্ধতিগতভাবে দমন করার অংশ হিসেবে গুমকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও অনেক অপরাধী এবং তাদের সহযোগীরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ঊর্ধ্বতনে থাকায় তদন্ত প্রক্রিয়া জটিল এবং ধীর গতিতে এগিয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক অসহযোগিতা, সাক্ষীদের ভয়ভীতি প্রদর্শনসহ নানা বাধার সম্মুখীন হয়া সত্ত্বেও ভুক্তভোগীরা তাদের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, গুম একটি সুশৃঙ্খল ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপে ‘জঙ্গিবাদবিরোধী’ অভিযানের আড়ালে পরিচালিত হয়েছিল, যার মাধ্যমে রাজনৈতিক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করাই মূল উদ্দেশ্য ছিল। এই প্রক্রিয়ায় মেধাবী শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক কর্মী, সাংবাদিক এবং সাধারণ মানুষরা হতভাগা হয়েছেন।
তিনি আরো জানান, ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থাকে অস্ত্র বানিয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও নিরাপত্তা বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবাধীন করা হয় এবং গোপন আটকের সংস্কৃতি চালু করা হয়। সাধারণ নাগরিকদের বেআইনিভাবে ভারতীয় বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল।
কমিশনকে ১৩১টি অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে, যা আইন অনুসারে পুলিশ মহাপরিদর্শকের কাছে পাঠিয়ে ভিকটিমদের সন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সংগঠক ও তদন্ত কর্মকর্তারা বলেন, গোপন আটক কেন্দ্রের অস্তিত্ব এখন অস্বীকার করা যায় না। ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের স্পষ্ট প্রমাণ বহন করে।
প্রতিবেদনে ১৯ শতাংশ পুনরায় ফিরে না আসা ১২ জন ভিকটিমের বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে, যাদের তদন্ত প্রাথমিক পর্যায়ে সম্পন্ন হয়েছে এবং গুমের জন্য দায়ীরা শনাক্ত করা হয়েছে। তবে চলমান অনুসন্ধানের স্বার্থে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
তদন্তে নানা প্রতিবন্ধকতা থাকলেও কমিশন কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া সন্ত্রাসবিরোধী মামলার অপব্যবহার রোধ করতে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে আলোচনা করে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো কার্যকর কাউন্টার টেরোরিজম পদ্ধতি গ্রহণের সুপারিশও করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে গুম সংক্রান্ত কমিশনের অন্যান্য সদস্য যেমন অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত বিচারক মো. ফরিদ আহমেদ শিবলী, মানবাধিকার কর্মী নূর খান, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সদস্য নাবিলা ইদ্রিস, মানবাধিকার কর্মী সাজ্জাদ হোসেন উপস্থিত ছিলেন।









