ঢাকা | রবিবার | ১২ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৯শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | ২৪শে শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি দেশে বড় অর্থনৈতিক ধাক্কা দেবে: সানেম

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) গবেষণায় সতর্ক করেছেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও এলএনজির দাম যদি দ্রুত ও বড়ভাবে বাড়ে তবে বাংলাদেশের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হবে। গবেষণায় বলা হয়েছে, এমন পরিস্থিতি প্রবৃদ্ধি, বাণিজ্য ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে একযোগে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

গবেষণায় ফলাফল অনুযায়ী, অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্য ৪০ শতাংশ এবং এলএনজির মূল্য ৫০ শতাংশ বাড়লে দেশের প্রকৃত জিডিপি প্রায় ১.২ শতাংশ কমে যেতে পারে। একই সময়ে রপ্তানি প্রায় ২ শতাংশ ও আমদানি প্রায় ১.৫ শতাংশ হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা করা হয়েছে।

সানেমের বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতি তীব্র করবে। সাধারণ ভোক্তা পর্যায়ে দাম প্রায় ৪ শতাংশ বাড়তে পারে এবং প্রকৃত মজুরি প্রায় ১ শতাংশ কমে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সংকুচিত হবে।

গবেষণাটি বৃহস্পতিবার প্রকাশিত হয় এবং এতে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনার প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল জোটের সংঘাত জ্বালানি উৎপাদন, ট্যanker চলাচল ও উপসাগরীয় সামুদ্রিক নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।

হরমুজ প্রণালি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হওয়ায় বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে বলে সানেমের বিশ্লেষণে উল্লেখ আছে। এই সংকট দেশটির মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর জ্বালানি যোগানের ওপর উচ্চ নির্ভরশীলতাকেই সূচিত করেছে। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের সরবরাহিত অন্তত ২০ শতাংশ এলএনজি এই প্রণালীর মাধ্যমে পরিবাহিত হয়, যা বর্তমানে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

রিপোর্টে বলা হয়, সাম্প্রতিক হামলার পর কাতারে এলএনজি উৎপাদন বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। বাংলাদেশ যে এলএনজির ওপর আমদানি করে তার প্রায় ৭২ শতাংশ আসে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে—তাই এই সরবরাহ ব্যাহত হলে দেশ বিশেষভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। এ সংকট এমন এক সময়ে এসেছে যখন ঘরোয়া গ্যাস উৎপাদন আগেই কমে যাওয়ায় কাঠামোগত ঘাটতি বিদ্যমান।

সানেম তাদের মডেলে তিনটি মূল প্রভাব চ্যানেল চিহ্নিত করেছে — জ্বালানি, রেমিট্যান্স, এবং বাণিজ্য ও সরবরাহশৃঙ্খল। এগুলোর মধ্যে জ্বালানি খাতে ধাক্কা সবচেয়ে সরাসরি ও তাত্ক্ষণিক প্রভাব ফেলে; আমদানিনির্ভর জ্বালানির দাম বাড়লে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়, চলতি হিসাবের ঘাটতি বাড়ে এবং মূল্যস্ফীতি ত্বরান্বিত হয়।

খাতভিত্তিক প্রভাবেও বড় ধরনের সংকোচনের সতর্কবার্তাও এসেছে। রিপোর্ট অনুযায়ী তৈরি পোশাক খাতে উৎপাদন প্রায় ১.৫ শতাংশ, পরিবহন খাতে প্রায় ৩ শতাংশ এবং কৃষিতে প্রায় ১ শতাংশ হ্রাস পেতে পারে। জ্বালানি-নির্ভর শিল্পখাতে আরও প্রবল প্রতিকূলতা দেখা দিতে পারে, যেখানে উৎপাদন প্রায় ২.৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।

সরকারি পদক্ষেপে সানেম মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখেছেন। কৃচ্ছ্রসাধন ও জ্বালানি রেশনিংয়ের ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে এগুলো পরিস্থিতি মোকাবিলায় কতটুকু কার্যকর হবে তা সন্দেহের কারণে প্রশ্ন উঠেছে।

এই প্রেক্ষাপটে সানেম কিছু সুপারিশও দিয়েছে। সংস্থাটি বলছে—জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে, দ্রুতভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির কার্যকর ও সহজলভ্য বিকল্পগুলোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে এবং কৌশলগত স্টক, বাণিজ্যিক বৈচিত্র্য ও রপ্তানিমুখী খাতগুলোকে ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করা উচিত। একই সঙ্গে জ্বালানি импোর্টের উৎস বৈচিত্র্য ও ঘরোয়া উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর কাজ বাড়াতে হবে।

সারকথা, বিশ্বের জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়লে তা বাংলাদেশে দ্রুত অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে—এ বিষয়ে রেডি‑মেড প্রস্তুতি, নীতিনির্ধারণে সতর্কতা ও পুনরায় শক্ত ঘরোয়া ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ বলে সানেম ধারণা করেছে।