ইলিশের ভরা মৌসুমে সত্ত্বেও পায়রা নদী রুপালি ইলিশে স্বাভাবিকভাবে পূর্ণ হচ্ছে না—ফলসে উপকূলীয় ১৪ হাজার ৬৮৯ জন জেলার জীবিকা সংকটের মুখে। জেলেরা বলছেন, সাগর মোহনায় গড়ে ওঠা ডুবোচর ও পায়রা নদীতে তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ছেলায় আসা গরম পানি ও বর্জ্যই প্রধান বাধা, ফলে ইলিশ নদীতে প্রবেশ এবং প্রজনন করতে পারছে না।
পায়রা নদীর জেলেরা দাবি করেন, আষাঢ়-শ্রাবণের জোয়ারে ইলিশ আসার কথা থাকলেও ডুবোচরের কারণে জোয়ারের প্রথম ভাগে স্রোত বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। ইলিশ জোয়ারের প্রথম ভাগে নদীতে প্রবেশ করে থাকলে ভালোভাবে প্রবেশ ও প্রজনন সম্ভব, কিন্তু ডুবোচর বাধার ফলে অনেক মাছ উল্টো পথে সাগরে ফিরে যাচ্ছে। এ কারণে জেলেদের জালে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ পড়ে না এবং সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
উপকূলীয় আমতলী ও তালতলীতে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা মোট ১৪,৬৮৯ জন—এর মধ্যে আমতলীতে ৬,৭৮৯ জন, তালতলীতে ৭,৯০০ জন। অধিকাংশ পরিবার দারিদ্রসীমার নিচে বাস করেন এবং পুরো বছরের আয়ের ওপর নির্ভরশীল। জেলেরা বলেন, ইলিশের ভরা মৌসুম অর্থাৎ আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র ও আশ্বিন এই চার মাসে সারা বছরের আয় নিশ্চিত করে, কিন্তু মৌসুম কেটেও পায়রায় ইলিশ না পাওয়ায় তাদের দিন কষ্টকর হয়ে গেছে।
পায়রা (বুড়িশ্বর) নদী বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বরিশাল, পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ নদী। দৈর্ঘ্য প্রায় ৯০ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ প্রায় ১২০০ মিটার, এবং নদী সর্পিলাকার। নদীটির উৎপত্তি বলা হয়েছে বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ উপজেলার কলসকাটি ইউনিয়নের পাণ্ডব নদী থেকে, পরে এটি বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়। পায়রা, বিষখালী ও বলেশ্বর নদীর মোহনায় মিলিত জলের গতিপথ ও মোহন এলাকার চরগুলো—যেগুলো জেলেরা ‘গাঙ্গের আইল’ নামে জানেন—জোয়ারের স্বাভাবিক প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করছে। ফলে নদীর নাব্যতা কমে যাচ্ছে এবং গভীরতা হ্রাস পাচ্ছে।
বিশেষ করে পায়রা-বিষখালী মোহনায় থাকা বড়াইয়ার ডুবোচরটি প্রায় ১৫–২০ কিলোমিটার বিস্তৃত এবং এটি ফকিরহাট থেকে আশার চর পর্যন্ত ছড়ানো। আশার চরের শেষে শুরু হওয়া নলবুনিয়ার ডুবোচর প্রায় ৭–৮ কিলোমিটার বিস্তৃত ও পায়রা নদীর প্রবেশমুখে অবস্থান করছে। প্রবেশমুখ অতিক্রম করে ৩–৪ কিলোমিটার ভেতরে পদ্মা ও কুমিরমারা ডুবোচর রয়েছে, যার বিস্তৃতিও প্রায় ৬–৭ কিলোমিটার। এসব চরের উপস্থিতি জোয়ারের পানিকে বাধাগ্রস্ত করে, ফলে সাগর থেকে নদীতে পর্যাপ্ত গভীর পানি প্রবেশ পাচ্ছে না।
স্থানীয় জেলে আলমগীর হাওলাদার বলেন, “ডুবোচর খনন করে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ না ফিরিয়ে আনলে পায়রা নদীতে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ পাওয়া যাবে না। জেলেদের রক্ষায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।” আরেক জেলে ছত্তার বলেন, “জোয়ারের প্রথম ভাগে স্রোত কম থাকায় ইলিশ প্রবেশ করতে পারে না; মধ্যভাগে স্রোত বাড়লে দুই-একটা মাছ আসে, সেটাই আমাদের ভরসা। কিন্তু তা দিয়ে সংসার চলে না।”
অন্য এক বড় কারণ হিসেবে উপজেলা ও জেলেরা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নেমে আসা গরম পানি ও বর্জ্যকেও দায়ী করেছেন। জানা যায়, ২০১৯ সালে তালতলী এলাকায় জোয়ালভাঙ্গার কাছে আইসোটেক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয় এবং ২০২২ সালে উৎপাদন শুরু করে। এরপর থেকেই কেন্দ্রটির গরম পানি ও বিভিন্ন বর্জ্য পায়রা নদীতে ফেলা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ওই গরম পানি নদীর তাপমাত্রা পরিবর্তন করে জীববৈচিত্র্যে প্রভাব ফেলছে এবং ইলিশের প্রবেশ ও প্রজনন ব্যাহত করছে—জেলেরা ও গবেষকরা এ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
বরগুনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জিয়া উদ্দিন বলেন, “ডুবোচরের কারণে পায়রা নদীর নাব্যতা কমেছে। জোয়ারের স্রোতের তীব্রতা হ্রাস পাওয়ায় ইলিশ প্রবেশে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। ডুবোচর খনন করে নাব্যতা ফিরিয়ে আনলে ইলিশ প্রবেশ ও প্রজননে সহায়তা হবে।”
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, নদীকেন্দ্র চাঁদপুরের অবসরপ্রাপ্ত মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ইলিশ গবেষক ড. মো. আনিছুর রহমান বলেছেন, “সাগর মোহনায় নাব্যতা সংকট ও ডুবোচরের কারণে ইলিশের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। ইলিশের জন্য গভীর পানি প্রয়োজন; সেই গভীরতা না থাকায় তারা নদীতে প্রবেশ করতে পারছে না। পাশাপাশি তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের গরম পানি ও বর্জ্যও সমস্যার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ।”
জেলেরা ও কর্মকর্তারা আবেদন করেছেন—ডুবোচর খনন করে নদীর স্বাভাবিক পথ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা, তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের তাপ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নজরদারি করা এবং ইলিশের প্রবেশ ও প্রজনন নিশ্চিত করতে দ্রুত যৌথ উদ্যোগ নেওয়া হোক। যতদিন এসব কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়া হবে, ততদিন পায়রা নদী ও উপকূলীয় জেলেদের দুর্দশা বাড়তেই থাকবে।







