ঢাকা | মঙ্গলবার | ২০শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৬ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | ১লা শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

তেলের আশীর্বাদ থেকে অভিশাপ: ভেনিজুয়েলার ইতিহাস

ভেনিজুয়েলার ইতিহাস আমাদের সামনে এক কঠিন কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে—প্রাকৃতিক সম্পদের পরিমাণ কি সত্যিই এক দেশের মানুষের সুখ-শান্তি নিশ্চিত করতে পারে? তেলের বিপুল ভান্ডার থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে দেশটির অবস্থা দেখে স্পষ্ট হয়, সম্পদ থাকলেও যদি সঠিক নীতি, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং জবাবদিহিমূলক শাসন ব্যবস্থা না থাকে, তবে তা উন্নয়নের বদলে স্থায়ী সংকটের দিকে ডেকে নিয়ে যায়। ইতিহাস প্রমাণ করে, স্পেনীয় উপনিবেশের আগে ভেনিজুয়েলার ভূমি ছিল বেশ কিছু আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আবাস, যেমন আ Morawak, কারিব, যারা প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কৃষিকাজ, শিকার এবং মাছ ধরা নিয়ে জীবনযাপন করতেন। ষোড়শ শতকে স্পেনীয় উপনিবেশবাদের সূচনায় সেই প্রাকৃতিক সামাজিক কাঠামো ভেঙে যায়। ইউরোপ থেকে আগত রোগ, জোরপূর্বক শোষণ ও সহিংসতা আদিবাসী সমাজকে খুবই অপ্রতুল করে তোলে। উপনিবেশিক অর্থনীতিও কোকো ও কফির মতো কিছু পণ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে এবং ভূমি ও ক্ষমতা সীমিত একটি শ্রেণির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, যার প্রভাব দেশ স্বাধীনতার পরেও রয়ে যায়।

উনিশ শতকের শুরুতে সিমন বলিভার নেতৃত্বে ভেনিজুয়েলা স্বাধীনতা লাভ করলেও অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক দিক থেকে স্বাধীনতা পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। স্বাধীনতার পর বেশ কষ্টকর সময় অতিবাহিত করে দেশটি, যেখানে সামরিক শাসন, স্থানীয় দ্বন্দ্ব এবং দুর্বল রাষ্ট্রব্যবস্থা সাধারণ মানুষের জীবনে দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা এবং সীমিত সুবিধার মধ্যে আটকে ছিল।

শতকের প্রথম দিকে, বিশেষ করে ২0 শতকের মাঝামাঝি সময়ে, ভেনিজুয়েলাকে লাতিন আমেরিকার অন্যতম উচ্চ আয়ের দেশ হিসেবে দেখা হতো। তেল আবিষ্কারের ফলে ১৯২২ সালে মারাকাইবো অঞ্চলে তেল উত্তোলন শুরু হয়, এবং দ্রুতই দেশটি বিশ্বে অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদনকারীরাষ্ট্রে পরিণত হয়। তেল রপ্তানি থেকে বিপুল অর্থ আসে, শহরগুলো দ্রুত উন্নত হয়, অবকাঠামো গড়ে ওঠে। তবে এই অগ্রগতির ছদ্মবেশের ভিতরে একটি বড় ঝুঁকি ছিল—অর্থনীতি একমাত্র তেলের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। কৃষি এবং শিল্প খাত অবহেলিত হয়, এবং অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য গড়ে ওঠে না।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে, বিশেষ করে ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে, ভেনিজুয়েলার মাথাপিছু আয় লাতিন আমেরিকার মধ্যে অন্যতম উচ্চ ছিল। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে বিশাল বিনিয়োগ হয়, মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ ঘটে। ১৯৭০-এর দশকে তেলের দামের বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সরকার তেল শিল্প জাতীয়করণ করে এবং রাষ্ট্রায়ত্ত পিডিভিএসএ প্রতিষ্ঠা করে। তবে দুর্নীতি, প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে তেল আয়ের সঠিক ব্যবহার সম্ভব হয়নি। তবে এই সময়ের উন্নয়ন দৃশ্যমান হলেও তা ভঙ্গুর ছিল এবং পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিল তেলের দামের ওঠানামার উপর।

তেলের দামের পতনের ফলে 1980 এর দশকে অর্থনৈতিক সংকটের মাথা আসে। মুদ্রার অবমূল্যায়ন, ঋণ সংকট এবং মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। 1989 সালে ভর্তুকি কমানোর বিরুদ্ধে ‘কারাকাসো’ নামে ব্যাপক গণবিক্ষোভ হয়, যা গণতন্ত্র এবং সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ভেঙে দেয়। দমন-পীড়নের মাধ্যমে সেই সংকট সামাল দেওয়া হলেও, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর মানুষের আস্থা কমে যায়।

এখানে হুগো চাভেজের উত্থান ঘটে। ১৯৯৮ সালে তিনি ক্ষমতায় আসার পর দেশের দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষের জন্য রাষ্ট্রের সক্রিয় ভূমিকার কথা বলেন। তেল আয়ের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্প চালু হয়, যেমন স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং খাদ্য সহায়তা। প্রথম দিকে, এসব উদ্যোগ অনেকের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে। তবে অর্থনীতির বৈচিত্র্য না করে, আরও বেশি রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রণ আর তেলনির্ভরতা ভবিষ্যতের জন্য আরো বেশি ঝুঁকি সৃষ্টি করে।

চাভেজের মৃত্যুর পর, তাঁর উত্তরসূরি নিকোলাস মাদুরো এর শাসনামলে তেলের দামের অপ্রত্যাশিত পতনের সঙ্গে সঙ্গে দেশটির সূর্য ডোবে যায়। বাজেট ঘাটতি পূরণের জন্য অতিরিক্ত মুদ্রা ছাপানো হয়, যার ফলে দেশটি ইতিহাসে এক ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতির মুখে পড়ে। খাদ্য ও ওষুধের সংকট, ভেঙে পড়া স্বাস্থ্যব্যবস্থা, বিদ্যুৎ ও পানীয় জলের অনিয়মিত সরবরাহের কারণে সাধারণ মানুষ অনেকটাই দুর্বল হয়, লাখো মানুষ দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন।

অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘ সময়ের দ্বন্দ্ব ও চাপ। শীতল যুদ্ধের পর থেকে, বিভিন্ন স্বার্থের কারণে দুই দেশের সম্পর্ক উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। হুগো চাভেজ ও মাদুরোর শাসনের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জটিল হয়, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন সরকারকে লক্ষ্য করে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এই নিষেধাজ্ঞাগুলোর সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ নাগরিকরা—রপ্তানি কমে যাওয়া, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঘাটতি এড়ানো কঠিন হয়ে ওঠে।

ভেনিজুয়েলার বাস্তবতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, দেশের সংকট গুরুতরভাবে কেবল অভ্যন্তরীণ ভুলের ফল নয়; বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতি, নিষেধাজ্ঞা এবং শক্তির ভারসাম্যও মানুষের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। তবে একই সঙ্গে বোঝা যায়, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি না থাকলে, কোনো দেশই বহিরাগত চাপের মোকাবিলা করতে সক্ষম নয়।

অর্থাৎ, ভেনিজুয়েলার ইতিহাস কেবল একটি দেশের উত্থান-পতনের কাহিনি নয়; এটি একটি সতর্কবার্তা—প্রাকৃতিক সম্পদ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, তবে তার সঠিক ব্যবহারের প্রজ্ঞা ও সুশাসনের অভাবে এগুলো বিপদে পরিণত হতে পারে। উন্নয়নশীল দেশে সমৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি হলো প্রাকৃতিক সম্পদের সদ্ব্যবহার, দুর্নীতি মুক্ত, সুশাসন ও মানবকেন্দ্রিক নীতির সাথে এই সম্পদকে কাজে লাগানো। আমাদের জন্য এই ইতিহাস একটি শিক্ষা: সম্পদের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয় সেই সম্পদ কিভাবে ব্যবহার করা হয়।

লেখক: ক্যামব্রিজ, ম্যাসাচুসেটস, যুক্তরাষ্ট্র থেকে।