ঢাকা | শুক্রবার | ১০ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৬শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২৫শে মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

নিজ্জার হত্যায় লরেন্স বিশনয় ও ‘গোল্ডি ব্রার’-এর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে অভিযোগ গঠন

যুক্তরাষ্ট্র লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি ফেডারেল আদালতে কানাডায় ২০২৩ সালের হরদীপ সিং নিজ্জার হত্যাকাণ্ড সম্পর্কিত একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দায়ের করেছে। অভিযোগে নাম করা হয়েছে ভারতীয় কারাগারে থাকা কুখ্যাত গ্যাংস্টার লরেন্স বিশনয় এবং তাঁর উত্তর আমেরিকা অঞ্চলের প্রধান সহযোগী সতিন্দরজিৎ সিং বা ‘গোল্ডি ব্রার’-কে। এই হত্যাকাণ্ডটি ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার সারে শহরের এক শিখ মন্দিরের বাইরে ২০২৩ সালের ১৮ জুন সংঘটিত হয়েছিল বলে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে।

অভিযোগপত্রে সন্ধান দেওয়া হয়েছে যে বিশনয় এবং গোল্ডি ব্রার ওই হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। মার্কিন তদন্তকারীদের অভিযোগ, ভারতীয় কারাগার থেকে বিশনয় চোরাই মোবাইল ফোন ব্যবহার করে পরিকল্পনা নিয়ন্ত্রণ করতেন; তিনি নিজ্জারের ছবি ও একাধিক ঠিকানা পাঠিয়ে হত্যার সুবিধার্থে সহযোগীদের সহায়তা করেছিলেন। অপর দিকে, গোল্ডি ব্রার উত্তর আমেরিকায় সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনা করতেন—যাকে অভিযোগপত্রে ‘লরেন্স বিশনয় অর্গানাইজড ক্রাইম গ্রুপ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

হরদীপ সিং নিজ্জার কানাডার নাগরিক ছিলেন এবং তাঁদের স্বাধীন শিখ রাষ্ট্র ‘খালিস্তান’ আন্দোলনের সঙ্গে নৈকট্য থাকার কথাও জানানো হয়। ভারতের দিক থেকে নিজ্জারকে আগেই ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। নিজ্জারের হত্যার পর কানাডা ও ভারতের সম্পর্ক জোরদার উত্তেজনার মধ্য দিয়ে গিয়েছিল; তখন কানাডার শীর্ষনেতারা প্রকাশ্যে বলেছিলেন হত্যাকাণ্ডের পেছনে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্টতার ‘বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ’ রয়েছে, যা নয়াদিল্লি প্রত্যাখ্যান করে বলে উল্লেখ করা হয়।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের দায়ের করা সাম্প্রতিক অভিযোগপত্রে ভারত সরকারের কোনো সরাসরি জড়িত থাকার কথা বলা হয়নি। লস অ্যাঞ্জেলেসে অনুষ্ঠিত সাংবাদিক সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা একইসঙ্গে জানান যে তারা কোনো সরকারি সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে নি।

কাজেই এই মামলা মূলত একটি বৃহৎ আন্তঃরাষ্ট্রীয় তদন্তের অংশ। কর্মকর্তাদের তথ্যে বলা হয়েছে যে মার্কিন ও কানাডিয়ান কর্তৃপক্ষ একত্রে তিনটি ভারতভিত্তিক অপরাধ চক্র সম্পর্কেও তদন্ত চালাচ্ছে; সেই মামলায় মোট ৩৭ জনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, মাদকপাচার ও চোরাচালানের অভিযোগ আনা হয়েছে এবং তাদের মধ্যে ২৪ জনকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার বা হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।

এর আগে ২০২৪ সালের মে মাসে কানাডীয় পুলিশেরও নিজ্জার হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার সন্দেহে চার ভারতীয় নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল; তখনও কানাডা জানিয়েছিল যে নিহতের সঙ্গে সংযুক্ত অন্যান্য সম্ভাব্য যোগসূত্র এবং কোনো সরকারি সংযোগ আছে কি না তা খতিয়ে দেখা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগপত্রে আসামীদের মধ্যে কিছু ব্যক্তিকে সরাসরি শুটার হিসেবে না করে ‘সহ-ষড়যন্ত্রকারী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই ঘটনার পর কূটনৈতিক তিক্ততা কিছুটা হ্রাস পেয়েছে এবং দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার পথে যেতে শুরু করেছে, যদিও পুরোপুরি রাজনৈতিক দূরত্ব কাটায়নি। সংক্ষেপে, কিছুকাল ধরে ক্যানাডার অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত ফোরামে আলোচনা-বিবাদ চলেছে এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও কূটনৈতিক বৈঠকের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে।

তবে কানাডার কিছু শিখ সংগঠন সরকারের অত্যন্ত নমনীয় বা আপোশী অবস্থার সমালোচনা করে যাচ্ছে। তারা অভিযোগ করেন যে অটোয়া যথাযথভাবে ঘটনার তদন্ত করে ভারতকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে ব্যর্থ হচ্ছে এবং বিদেশি হস্তক্ষেপ ও সন্ত্রাসী দমন-নির্যাতন থেকে কানাডিয়ান শিখ সম্প্রদায়কে সুরক্ষিত রাখতে সরকার যথেষ্ট কার্যকর ভূমিকা নেয়নি।

মামলার এই নতুন ধারা—যুক্তরাষ্ট্রে অভিযোগপত্র দায়ের—আন্তর্জাতিক তদন্তকে আরও জোরদার করবে বলে বিশ্লেষকরা বলছেন। এরপর কী পর্যায়ে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা চলবে এবং আন্তর্জাতিকভাবে এই ঘটনার রাজনৈতিক প্রভাব কতটা হবে, তা ভবিষ্যতে আদালতি কার্যক্রম ও কূটনৈতিক মেলামেশার ওপর নির্ভর করবে।