ঢাকা | মঙ্গলবার | ১০ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৫শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | ২১শে রমজান, ১৪৪৭ হিজরি

নীতিগত দুর্বলতা, উচ্চ সুদ ও আমলাতান্ত্রিক জটিলে অর্থনীতি সংকটে

উচ্চ সুদ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও নীতিগত দুর্বলতার সংমিশ্রে দেশের অর্থনীতি বর্তমানে চাপে আছে—এমন সতর্কতা জানিয়েছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ডিসিসিআই। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে নিম্নতম পর্যায়ে এবং রপ্তানিতেও নতুন চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে।

এসব সমস্যা নিয়ে সোমবার মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত সেমিনারে বিশ্লেষণ ও পরামর্শ তুলে ধরা হয়। ‘বেসরকারিখাতের দৃষ্টিতে অর্থনীতির বিদ্যমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পর্যালোচনা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে সংগঠনের সভাপতি তাসকীন আহমেদ লিখিত বক্তৃতা দেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি।

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেন, অর্থনীতি এখন বিভক্ত অবস্থার দিকে এগোচ্ছে—‘খাতের কিনারে’ এসে পড়েছে। তিনি সরকারের পক্ষ থেকে অর্থনীতিকে শক্তিশালী অবস্থায় নেওয়ার চেষ্টা চলছে এবং কর-জিডিপি বাড়াতে রাজস্ব লিকেজ বন্ধ করার ওপর জোর দেয়ার কথা জানান।

ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, রপ্তানির বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং নতুন বাজারের সন্ধান ছাড়া অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা কঠিন। তিনি এলডিসি উত্তরণের পরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বজায় রাখা বাজারে প্রবেশাধিকার রক্ষা ও বাণিজ্য প্রক্রিয়া সহজ করার জরুরি প্রয়োজনই তুলে ধরেন।

রাজস্ব ও বাজেট সংক্রান্ত চিত্রও উদ্বেগজনক। তিনি জানান, ২০২৫ অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) যে দুই লাখ ৩১ হাজার ২০৫ কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল, তা অর্জিত হয়নি। ২০২৪–২৫ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২.২৬ ট্রিলিয়ন টাকা (জিডিপির ৪.১%), যা প্রাথমিকভাবে নির্ধারিত ২.৫৬ ট্রিলিয়ন টাকার চেয়ে কম। কর-জিডিপি অনুপাত ২০২৪–২৫ অর্থবছরে কমে ৬.৫৬ শতাংশে নেমে এসেছে, আগের বছরের ৭.২ শতাংশের তুলনায়।

কর ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে তিনি বললেন, পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন না থাকায় কর আদায়ে বিলম্ব ও স্বচ্ছতার অভাব দেখা দেয়। তাই প্রত্যক্ষ করের ওপর গুরুত্ব বাড়িয়ে অনানুষ্ঠানিক ও আন্ডার-রিপোর্টেড খাতকে করের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। পাশাপাশি ই-নিবন্ধন, ই-রিটার্ন, ই-পেমেন্ট, ই-অডিট ও ই-রিফান্ডসহ একটি সমন্বিত ডিজিটাল সেবা চালু করে ভ্যাট, আয়কর ও কাস্টমস মিলিয়ে কেন্দ্রীয় ডেটাবেস গড়ে তোলার দাবি করেন তাসকীন।

মুদ্রানীতি ও ব্যাংকিং সেক্টরের প্রভাবও স্পষ্ট। তিনি জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করায় নীতি সুদহার ১০ শতাংশে স্থির থাকায় বাণিজ্যিক ঋণের সুদ ১৬ শতাংশ বা তারও বেশি পর্যায়ে উঠে গেছে। এর ফলে বেসরকারি খাতের ঋণ গ্রহণ ও বিনিয়োগ মন্থর হয়ে পড়েছে।

মূল্যস্ফীতিও দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগের সূচক। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮.৪৯ শতাংশে—সরকারের লক্ষ্যমাত্রার উপরে। খাদ্যমূল্যস্ফীতি কমে ৭.১ শতাংশ হলেও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯.১৩ শতাংশে রয়েছে। তাসকীন বলেন, ‘‘মূল্যস্ফীতি কোনো সাময়িক সমস্যা নয়; এটি কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতা ও নীতিগত দুর্বলতার প্রতিফলন।’’

বাজারে অব্যবস্থাপনা, অবৈধ সিন্ডিকেট এবং অতিরিক্ত সরকারি ঋণ গ্রহণ বর্তমান পরিস্থিতির বড় কারণ হিসেবে তিনি চিহ্নিত করেন। সমস্যাগুলো মোকাবিলায় তিনি বাজার নজরদারি জোরদার করা, মজুদবিরোধী আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করে সিন্ডিকেট ভাঙা, সরবরাহ শৃঙ্খল শক্তিশালী করা, দক্ষ জনশক্তি গঠন এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

কৃষি খাতে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন—২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে কৃষি খাতের জিডিপিতে অবদান কমে ২.৩ শতাংশে নেমে এসেছে। আনুসাঙ্গিক সমস্যাগুলো সমাধান করলে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবে ও অপচয় কমবে বলে তিনি মনে করেন। বর্তমানে মাত্র ৫০ শতাংশ কৃষক যান্ত্রিক চাষাবাদ ব্যবহার করেন, যেখানে ভারতে এই হার প্রায় ৮০ শতাংশ। কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ বাড়াতে তাসকীন লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি ও জামানতবিহীন স্বল্পসুদের ঋণের প্রস্তাব রাখেন।

রপ্তানি ক্ষেত্রে প্রস্তুত পোশাক শিল্পের রফতানি বছর শেষে ১৯.৩৭ বিলিয়ন ডলার হলেও আগের বছরের তুলনায় খানিকটা কমেছে—নতুন বাজার আবিষ্কার জরুরি। তিনি ইউরেশিয়ান ইকোনমিক ইউনিয়ন, মারকোসুর ও আণবিকভাবে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করার পরামর্শ দেন এবং ম্যানমেড ফাইবারভিত্তিক পণ্যের জন্য ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ উন্নতির ওপর জোর দেন।

চামড়া শিল্পে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে সিওয়াআইটিপি/সেন্ট্রাল ইফ্লুয়েন্ট টুকট পলিউশন(?) (সিইটিপি) সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাও তিনি উল্লেখ করেন—সাভারের সিইটিপির পরিশোধন ক্ষমতা ১৪ হাজার কিউবিক মিটার থেকে ৩৫ হাজার কিউবিক মিটার করা উচিত। কোরবানির সময় কাঁচা চামড়া সংরক্ষণ ঘাটতির ফলে প্রতি বছর ১০–২০ শতাংশ কাঁচা চামড়া নষ্ট হয়; এ সমস্যা কমাতে তিনি এতিমখানা, মাদ্রাসা ও মসজিদকে স্বল্পমূল্যে বা বিনামূল্যে লবণ ও বরফ সরবরাহের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দেন।

সমগ্র সেমিনার জুড়ে পুনরাবৃত্তি হয়েছে—নীতিগত সংস্কার, বিনিয়োগ ও ঋণ প্রবাহ বাড়ানো, রপ্তানি বিভিন্নীকরণ এবং কৃষি-শিল্পে প্রযুক্তি ও অবকাঠামো বিনিয়োগ ছাড়া টেকসই উন্নতি আনা সম্ভব হবে না। ডিসিসিআইর উপস্থাপিত পরামর্শগুলো বাস্তবায়িত হলে দ্রুততম সময়ে বিশ্বাসযোগ্য পুনরুদ্ধার সম্ভাবনা জাগবে—এটাই বক্তারা আশা প্রকাশ করেছেন।