ঢাকা | রবিবার | ৩রা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২০শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৬ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

পরিবেশ, বন ও বন্যপ্রাণী সুরক্ষায় এক বছরে মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সফলতা

পরিবেশ, বন এবং জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের নেতৃত্বে গত এক বছরে বন, বন্যপ্রাণী, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

সরকারি প্রকল্পের জন্য বনভূমি হস্তান্তরের পুরনো সিদ্ধান্ত বাতিলের ধারাবাহিকতায় কক্সবাজারে ৭০০ একর বন এবং বাফুফের জন্য সংরক্ষিত ২০ একর বনভূমি পুনরায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এছাড়া সোনাদিয়ায় ৯,৪৬৭ একর বন এবং জাফর আলম ক্যাডেট কলেজের নামে বন্দোবস্তকৃত ১৫৫ দশমিক ৭০ একর জমিও পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। আগস্ট ২০২৪ থেকে জুন ২০২৫ পর্যন্ত ৫,০৯৩ একর বনভূমি উদ্ধার করে সেখানে পুনরায় বনায়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে।

চুনতি বন পুনরুদ্ধার প্রকল্পের মাধ্যমে ৩৭,১৮২ একর এলাকায় আকাশমনি গাছ সরিয়ে প্রকৃত প্রাকৃতিক বন ফিরিয়ে আনার কাজ শুরু হয়েছে। মধুপুর ও শেরপুরে একই উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে যাতে হাতির জন্য অভয়ারণ্য হিসেবে ব্যবহৃত করিডোর পুনরায় কার্যকর হয়।

বিলুপ্তপ্রায় দেশি ময়ূর সহ সাম্বার হরিণ, কালোমুখ প্যারা পাখি, উল্লুক এবং হাতির সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মানুষের এবং বন্যপ্রাণীদের সংঘর্ষ কমাতে ১৫৯টি ইআরটি দল গঠন করা হয়েছে এবং ব্যাপক জনসচেতনতা কর্মসূচি গ্রহন করা হচ্ছে।

মৌলভীবাজারের লাঠিটিলা সাফারি পার্ক প্রকল্প বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে এবং ক্যাপটিভ হাতির জন্য পৃথক অভয়ারণ্য গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাজশাহীর বিল জোয়ানা ও বিল ভেলা সহ কয়েকটি জলাভূমিকে অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়েছে এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে।

বন্যপ্রাণী আইন সংশোধন করা হচ্ছে এবং ট্রাস্ট গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ওয়াইল্ড লাইফ ক্রাইম কন্ট্রোল ইউনিট এ পর্যন্ত ২৯৩টি অভিযান পরিচালনা করে ৫,৬৮৪ প্রাণী উদ্ধার করেছে। সাফারি পার্ক থেকে চুরি হওয়া লেমুরও উদ্ধার করা হয়েছে। প্রথমবারের মতো বন্যপ্রাণী ও বৃক্ষ নিধনের অপরাধে আইনানুগ শাস্তির ব্যবস্থা কার্যকর হয়েছে।

জনমতের প্রেক্ষিতে ইউক্যালিপটাস ও একাশিয়া গাছের চারা উৎপাদন, বিপণন এবং রোপণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট নার্সারিগুলো ধ্বংস করা হয়েছে। পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধিতে ‘গাছ থেকে পেরেক তুলে ফেলা’ কর্মসূচি শুরু হয়েছে এবং প্রথমবারের মতো নেচার লার্নিং সেন্টার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তরুণ প্রজন্মকে বন, বন্যপ্রাণী ও শব্দদূষণ রোধে সচেতন করানো হচ্ছে। জাতীয় উদ্যান, ইকোপার্ক ও উদ্ভিদ উদ্যানে প্লাস্টিক ও বনভোজন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পূর্বাচলের ১৪৪ একর এলাকা বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য ঘোষণা করা হয়েছে।

ঢাকার শপিংমলগুলোতে নিষিদ্ধ পলিথিন ব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে এবং কাঁচাবাজারে অভিযান জোরদার করা হয়েছে। বিকল্প হিসেবে পাটের ব্যাগ সহজলভ্য করার জন্য পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে ‘ন্যাশনাল এয়ার কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান’ প্রণয়ন করা হয়েছে এবং ৮৩০টি অবৈধ ইটভাটা ভেঙে ফেলা হয়েছে। ঢাকার সাভার-আশুলিয়ার এলাকা ডিগ্রেডেড এয়ারশেড হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

শব্দদূষণ রোধে তরুণরা অংশ নিয়ে ক্যাম্পেইন পরিচালনা করেছেন। গাজীপুরে গাছা খাল দূষণের অভিযোগে ৯টি প্রতিষ্ঠান থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে এবং সমস্ত পলিথিন কারখানা বন্ধ করা হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের জন্য BEST প্রকল্পের আওতায় নতুন কার্যক্রম অনুমোদন করা হয়েছে এবং ৩৭টি ভবনের নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে। ১৬টি জেলা থেকে পাহাড়ের দাগ-খতিয়ান সংগ্রহ করে অনলাইনে তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থায়নে ৩৫১ কোটি টাকার ৪১টি প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। বাংলাদেশের জলবায়ু উন্নয়ন সহযোগিতা ‘বাংলাদেশ ক্লাইমেট ডেভেলপমেন্ট পার্টনারশিপ’ চূড়ান্ত করা হয়েছে। পরিবেশ ও বন সংরক্ষণে ৮টি নতুন আইন, বিধিমালা ও নির্দেশিকার খসড়া প্রস্তুত চলছে।

উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এই সকল সাফল্যের ভিত্তিতে দেশের পরিবেশ সুরক্ষা, বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং জলবায়ু অভিযোজন প্রক্রিয়ায় সকল নাগরিকের সমন্বিত অংশগ্রহণের গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তার নেতৃত্বে চলমান এই অগ্রযাত্রায় দেশের পরিবেশ নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে যা আগামী প্রজন্মের জন্য এক অনন্য সম্পদ হিসেবে থাকবে।