ঢাকা | শুক্রবার | ১লা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৮ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৪ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

পাহাড় কেটে গাছ ক TPUে প্রচণ্ড ক্ষতি সত্ত্বেও পার্ক নির্মাণ

চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে পাহাড়ি টিলা কেটে প্রায় এক একর জমিতে একটি ব্যক্তিগত পার্ক স্থাপন করা হয়েছে, যার নাম ‘আমানা পার্ক’। বাঁশখালী পৌরসভার ৫নং ওয়ার্ডের উত্তর জলদি এলাকায় অবস্থিত এই পার্ক নির্মাণে প্রায় পাঁচ হাজার গাছ কাটা হয়েছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন, যারা বলছেন এতে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ব্যাপক ক্ষতি ঘটেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, বাঁশখালীর মিয়ার বাজার থেকে দু’কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই পার্কে যাওয়ার রাস্তা বর্ষাকালে দুর্বল হওয়ায় খুব বেশি দর্শনার্থী দেখা যায় না। যেসব দর্শনার্থী আসেন তাদের জন্য প্রবেশদ্বারে টিকেট কাউন্টার রয়েছে, যেখানে প্রতি টিকিটের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০ টাকা। পার্কে পাহাড় চড়া সহজ করার জন্য একটি সিঁড়ি তৈরি করা হয়েছে। পাহাড়ের ওপরে বন্যপ্রাণী রূপে ভাস্কর্য এবং দর্শনার্থীদের বসার জন্য কংক্রিটের বেঞ্চ রয়েছে, যা পুরো আয়োজনের প্রধান আকর্ষণ।

স্থানীয়রা জানান, ২০২৪ সালের শুরুতে টিলা কেটে পার্ক নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এটি দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। তারা দাবি করেন, এই পার্কের জায়গা পূর্বে বনাঞ্চল ছিল এবং সেখানে প্রায় পাঁচ হাজার গাছ ছিল। বন বিভাগ কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত এই জায়গাটি ব্যক্তিগত মালিকের অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পার্কের উদ্যোক্তা মোহাম্মদ মুমিন সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, তিনি বৈধ ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে পার্ক স্থাপন করেছেন এবং গাছপালা বা পাহাড় কাটেননি। তবে উপজেলা প্রশাসন বা বন বিভাগের অনুমতি পত্র তিনি দেখাতে পারেননি।

স্থানীয় কলেজ ছাত্র এনামুল হক বলেন, ‘পার্কে আসা তরুণ-তরুণীদের শখের জায়গা হলেও এখানে প্রকৃতির সৌন্দর্য নষ্ট হয়েছে, যা কোনো পর্যটন আকর্ষণ নয়।’ তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, এমন একটি জায়গায় পার্ক নির্মাণের অনুমতি কিভাবে মিলে গেল, যেখানে প্রকৃতির অপরূপ দৃশ্য বিদ্যমান ছিল।

বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস্ ফাউন্ডেশনের মহাসচিব অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান বলেন, ‘পাহাড় কাটার মাধ্যমে পার্ক নির্মাণ আইন অনুসারে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। হাইকোর্ট থেকেও কঠোর নির্দেশনা রয়েছে পাহাড় ও গাছ কাটার বিষয়ে, কিন্তু তা মানা হচ্ছে না, যা পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে।’

কলেজ শিক্ষক নুরুল মোস্তফা চৌধুরী স্থানীয় প্রশাসন ও বন বিভাগের অবহেলার জন্য বাঁশখালীর পাহাড়ি বনাঞ্চল ধ্বংস হওয়ার কথা তুলে ধরেন এবং বলেন, ‘ভূমিদস্যুদের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রশাসন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি।’

চট্টগ্রাম বিভাগের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কর্মকর্তা দীপান্বিতা ভট্টাচার্য্য জানিয়েছেন, পার্কটি যদি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন হয়, তবে বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনের; কিন্তু যদি বন বিভাগের জায়গা হয়, তাহলে বন বিভাগই বিষয়টি দেখবে।

চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের জলদি রেঞ্জ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান জানান, ‘এখানে বন অধিদপ্তরের অনুমতি নেই এবং উদ্যোক্তাকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। বর্ষার পর জায়গাটি জরিপ করে সীমানা নির্ধারণ করা হবে এবং বন বিভাগের জায়গা থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন বাঁশখালী ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের বনাঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হলে বন্যপ্রাণীর অবস্থাও ঝুঁকির মধ্যে পড়বে এবং সামনের দিনে বড় ধরনের পরিবেশ সচেতনতা ও আইনি ব্যবস্থা জরুরি।

বাঁশখালি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ জামশেদুল আলম জানান, তিনি পার্ক নির্মাণের সময় ওই এলাকায় ছিলেন না এবং বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন। পার্কের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের জন্য উপজেলা প্রশাসনের অনুমতি নেওয়া প্রয়োজন এবং তিনি বিষয়টিতে খোঁজ-খবর করছেন।