পবিত্র ঈদুল ফিতর নিকটে আসলেও এবং রমজানের তিন সপ্তাহ অতিক্রম করলেও দেশের ফ্যাশন হাউসগুলোর কাছে এখনো যে উড়াল ভিড়ের আশা ছিল, তা কষ্টেই পূরণ হচ্ছে। প্রায় ৫ হাজারের বেশি ছোট-বড় ফ্যাশন হাউস এবং কয়েকশো প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ড উৎসব মৌসুমে বড় অংশের বিনিয়োগ ও আয়ের ওপর নির্ভর করে। তবু এবারের বাজারের চিত্র বেশ বৈচিত্র্যময়—একদিকে হতাশার ছোঁয়া, অন্যদিকে কিছু অংশে আশার খেলা দেখা যাচ্ছে।
টুয়েলভ, লা রিভ, আড়ং, ক্যাটস আই কিংবা রঙ বাংলাদেশের মতো ব্র্যান্ডগুলো তাদের নতুন সংগ্রহ এনেছে; তবু ক্রেতাদের মধ্যে আগের মতো তীব্র কেনাকাটার ঝোঁক নেই। ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নতুন সরকার গঠনের পর বাজারে ধীরগতির অবস্থা কাটবে—এই প্রত্যাশা ছিল। বাস্তবে অবশ্য বেচাকেনায় মিশ্র ধারা দেখা যাচ্ছে: কিছুতে ভিড়, কিছুতে মন্থরতা।
ফ্যাশন উদ্যোক্তারা গাণিতিকভাবে আশা করেছিলেন গত বছরের তুলনায় অন্তত ১০–১৫ শতাংশ বেশি বিক্রি হবে। সে প্রত্যাশা নিয়ে রাজধানীর নামী শপিং মলগুলো ও অলিগলির আউটলেটগুলো সাজানো হয়েছে। কিন্তু বাসা চলার মতো ক্রেতারা ধীরগতি রেখে সময় নিয়ে কেনাকাটা করছেন। বসুন্ধরা সিটি, যমুনা ফিউচার পার্ক থেকে মিরপুর, এলিফ্যান্ট রোড ও আজিজ মার্কেট—এইসব এলাকায় দেখা যায় ক্রেতারা জামাকাপড় দেখে যাচ্ছেন, দামের তুলনায় মানকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। গত বছরের শেষ মুহূর্তের হুড়োহুড়ি এখন পর্যন্ত নেই। বিশেষত গরম ও গুমোট আবহাওয়ার কারণে অনেকেই হালকা সুতি কাপড়ই বেশি পছন্দ করছেন।
এবার অনেক ফ্যাশন হাউসে আধুনিক কাটা যুক্ত দেশি ঐতিহ্যের ফিউশনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবু ভিন্ন এলাকায় ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। এলিফ্যান্ট রোডের কিছু প্রতিষ্ঠিত আউটলেট জানায়, তাদের বিক্রি এখনও আশানুরূপ হয়নি এবং বাজার অনিশ্চিত মনে হচ্ছে। অন্যদিকে কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় ফ্যাশন হাউস দাবি করেছেন তাঁদের বিক্রি গত বছরের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে—বিশেষ করে নির্দিষ্ট গ্রাহকগোষ্ঠী এখনো ব্র্যান্ড শপে ভরসা রাখছেন। রঙ এবং পোশাকের বৈচিত্র্য নির্ভর করেই কিছু ব্র্যান্ডের বিক্রির উত্থান মনে করা যাচ্ছে।
পোশাকের ধরনে মেয়েদের থ্রি-পিস ও টু-পিসের চাহিদাই সর্বোচ্চ থাকছেই। সিল্ক, খাদি, বয়েল থাকা সত্ত্বেও এবারে সুতি পোশাক সবচেয়ে জনপ্রিয়। পুরুষদের মধ্যে দৃশ্যত বড় পরিবর্তন না থাকলেও আধুনিক কাটা পাঞ্জাবি ও পাজামার চাহিদা স্থিতিশীল রইল। পাইকারি বাজারের মন্থর গতি সরাসরি খুচরা বাজার ও শোরুমে প্রভাব ফেলছে—মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো দাম ভাবেই হাতে-পায়ে কেনাকাটা করছেন এবং তুলনামূলক বাজেটের মধ্যে ভালো জিনিস খুঁজতে বিভিন্ন মার্কেটে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় চাপ ও নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধিই ফ্যাশন সেক্টরে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। ‘রঙ বাংলাদেশ’-এর মতো কিছু ব্র্যান্ড গত বছরের তুলনায় কিছুটা বেশি বিক্রি করলেও সামগ্রিকভাবে বাজার পুরোপুরি চাঙ্গা হয়নি; আগামী কয়েক দিনই প্রকৃত চিত্র নির্ধারণ করবে। শেষ মুহূর্তের ভিড় না গেলে উৎসবনির্ভর এই বড় বাজার আয়ের ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। সংক্ষেপে, এবারের ঈদ কেনাকাটার যে অনিশ্চয়তা ও আস্থাহীনতার ছাপ দেখা যাচ্ছে—তার উত্তরণ নির্ভর করছে আসন্ন কয়েক দিনের ক্রেতা উপস্থিতি ও শেষ মুহূর্তের ক্রয়ের ঢেউয়ের ওপর।








