রাউজান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স—সর্বসম্মতে ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত ৫০ শয্যার এই হাসপাতালটি গেলোরও বেশি বিস্তীর্ণ জমিতে তৈরি হলেও কার্যত একতলা ভবনে সেবা পরিচালিত হচ্ছে। অবকাঠামো ও জনবল সংকট, গৃহীত সরঞ্জাম অকেজো হয়ে পড়া এবং স্যানিটেশন ঘাটতির কারণে রোগী-পরিবেশের ভেতরেই প্রতিষ্ঠানটি যেন নিজেই রোগাক্রান্ত অবস্থায় আছে।
হাসপাতালের নথি অনুযায়ী এখানে মোট পাঁচটি অ্যাম্বুলেন্স থাকা কথা। তবু মাঠপর্যায়ে দেখা যাচ্ছে সেই পাঁচটির মধ্যে তিনটি দীর্ঘদিন ধরে অকেজো পড়ে আছে। বাকি দুটির মধ্যে অধিকাংশ সময়ই চালু থাকে; তবু চালক রয়েছেন মাত্র এক জন—ফলে জরুরি রোগী পরিবহনে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটছে।
পরিচ্ছন্নতাকর্মীর সংখ্যা থাকা উচিত পাঁচজন, হাসপাতালের বাস্তব অবস্থায় আছেন মাত্র দুজন। বিদ্যুৎ বিভ্রাটে বেকআপ হিসেবে থাকা জেনারেটরটিও বহুদিন ধরে খারাপ। হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক থাকেন না—এই অভিযোগও স্থানীয়দের। এসব কারণে সেবা প্রদান, জরুরি চিকিৎসা ও রোগীর আস্থায় বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিয়েছে।
সরেজমিন দেখা গেছে হাসপাতালের একাংশে টিনশেডের নিচে পড়ে আছে কোটি টাকা মূল্যের একটি বিশেষায়িত আইসিইউ সুবিধাসম্পন্ন অ্যাম্বুলেন্স, যা করোনা মহামারির সময় ভারত সরকারের দেওয়া হয়েছিল। নেওয়ার পর থেকে তা কখনো ব্যবহার করা হয়নি বলে স্থানীয়রা জানায়। অবকাঠামোগত নকশাগত ত্রুটি ও অবস্থানগত কারণে পুরো চত্ত্বর সারা বছরই স্যাঁতসেঁতে থাকে, যা বর্ষা মৌসুমে আরও ভয়াবহ হয়।
হাসপাতালে এসে দেখা রোগীরা আর দ্বিধা-দ্বন্দ্ব খুলে বলছেন—চিকিৎসা মিললেও পরিবেশ নোংরা ও অনুপযোগী। এক রোগী আবদুল করিম বলেন, “বছরবার একই অবস্থা। চিকিৎসা পেলাম, কিন্তু পরিবেশ ও পরিষ্কারের অভাব মন খারাপ করে।” সন্তানের চিকিৎসা নিয়ে আসা কহিনুর আক্তার বলেন, “হাসপাতালে আধুনিকতার ছোঁয়া নেই। আশপাশের সড়ক উঁচু করে জলাবদ্ধতা নিরসন করা প্রয়োজন।” সম্পা রানী প্রীতি যোগ করেন, “বর্ষা মৌসুমে চত্বর পানিতে ভরে যায়, রোগী-স্বজনদের ভোগান্তি হয়।”
পরিদর্শনে দেখা যায় চিকিৎসক ও কর্মচারীদের থাকার জন্য নির্মিত ৯টে আবাসিক ভবনের বেশির ভাগই পরিত্যক্ত—লতা-পালা ও ঝোপঝাড়ে ঢাকা, ভেতরের সড়ক কাদাপূর্ণ ও চলাচলের অনুপযোগী। কিছু বাসিন্দার অভিযোগ এলাকায় বিষধর সাপের উপদ্রব আছে; একই সঙ্গে মশা-মাছি ও অন্যান্য রোগজীবাণুর উপস্থিতি বেশি। হাসপাতালের ওয়ার্ডে রোগীর খাটের নিচে বিড়াল ঘোরাঘুরি করছে; টয়লেটগুলো নোংরা এবং অনেকের দরজা ভাঙা—স্যানিটেশন মারাত্মকভাবে দুর্বল।
এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, “নতুন নিয়োগে কিছু চিকিৎসক যোগ দিয়েছেন, ফলে সংকট কিছুটা কমেছে। তবু পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ আরও অনেক শূন্য পদ এখনো পূরণ হয়নি। পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকায় জরুরি সংস্কার কাজ করা যাচ্ছে না।” তিনি আরও জানান, একতলা নকশা ও অভ্যন্তরীণ স্তররেখার কারণে সারা বছরই পানি জমে স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ তৈরি হয়, যা বর্ষায় আরও ভয়াবহ আকার নেয়।
স্থানীয়রা চাই দ্রুত পদে-পদে জনবল নিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও অকেজো অ্যাম্বুলেন্সগুলো দ্রুত সচল করার উদ্যোগ—অন্যান্যথায় না হলে রাউজান উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সের সেবা মান আরও নিচে নামবে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।








