ঢাকা | বুধবার | ১০ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৭শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২৪শে জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

ল্যানসেটে: খাদ্যবাহিত রোগে ২০২১ সালে প্রায় ১৫ লাখ মৃত্যু

একটি নতুন গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সালে বিশ্বজুড়ে আনুমানিক ১৫ লাখ মানুষ খাদ্যবাহিত রোগে প্রাণ হারিয়েছেন — যা উদ্বেগজনক একটি সংখ্যা এবং খাদ্যনিরাপত্তা উন্নয়নের জরুরি আহ্বানও তুলেছে। ল্যানসেটে প্রকাশিত রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে দূষিত খাবারের কারণে সৃষ্ট এই রোগের বোঝা কমাতে দেশগুলোকে কার্যকর খাদ্যনিরাপত্তা কৌশল দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।

গবেষণার ফলাফল অনেকের কাছে হতবাক লাগতে পারে, তবে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এটি সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য কিছু নয়। নিউইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডা. হ্যারিস ওয়াং—যিনি এই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন না—বলেছেন, খাদ্যবাহিত রোগের প্রভাব দীর্ঘদিন ধরে অবমূল্যায়িত হয়ে আসছে। কানাডার লাভাল বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্যবিজ্ঞানী ডা. জুলি জিন (গবেষণায় অনিদিষ্ট) বলেন, মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা ও রোগ এবং প্রতিবন্ধকতার মোট বোঝা (ডিএএলওওয়াইএস) দেখে অনেকে বিভ্রান্ত হতে পারেন; কিন্তু এ রোগের সামষ্টিক ক্ষতি অনেক বড়।

প্রতিবেদন ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্যবাহিত রোগের কারণে যে ক্ষতিটা হয় তা কেবল পেটের অসুখেই সীমাবদ্ধ নয়—অনেক ক্ষেত্রে তা সেপসিস বা ব্যাকটেরেমিয়ার মতো প্রাণঘাতী জটিলতায় রূপ নিতে পারে। মূল কারণগুলোতে রয়েছে পরজীবী, রাসায়নিক দূষণ এবং বিভিন্ন অণুজীব—বিশেষ করে সালমোনেলা, ইশেরিশিয়া কোলাই, নোরোভাইরাস এবং লিস্টেরিয়া।

খাবারের সঠিক তাপমাত্রায় না রাখা বা অপর্যাপ্তভাবে রান্না করা হলে ব্যাকটেরিয়া দ্রুত বেড়ে যায়। আবার প্রস্তুতি ও পরিবেশনের সময় স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণে ভাইরাস ছড়াতে পারে। এসব কারণে বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে মৃত্যু ও গুরুতর সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে, কারণ সেখানে খাদ্যনিরাপত্তার নিয়ন্ত্রণ, নিয়মকানুন এবং স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতায় সমস্যা আছে।

ব্যক্তিগতভাবে ঝুঁকি ভিন্ন: ছোট শিশুরা, বয়স্করা, গর্ভবতী নারী এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল ব্যক্তিরা বেশি ভুগতে পারেন। কিছু ওষুধ বা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমের ভারসাম্য নষ্ট হলে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। সাধারণ লক্ষণের মধ্যে থাকেঃ বমি, ডায়রিয়া, পেটব্যথা, জ্বর ও ক্লান্তি; কিন্তু তিন দিনের বেশি স্থায়ী ডায়রিয়া, উচ্চ জ্বর বা মলে রক্ত দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।

বেসিক কিন্তু কার্যকর কিছু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ঘরে করেই নেওয়া যায়। খাবার ভালো করে রান্না করা—বিশেষ করে মাংস ও ডিম—অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাঁচা বা অপরিষ্কার দুগ্ধজাত খাবার ও অপ্রস্তুত বাজারজাত প্যাকেটজাত সালাদ কিংবা কাঁচা মাছ ও পাতলা কাটা মাংস (যেগুলো পুনরায় গরম না করলে ঝুঁকিপূর্ণ) ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিতে পারে, সুতরাং সতকতা অবলম্বন করা উচিত। রান্না করা বা কাটা খাবার দুই ঘণ্টার মধ্যে ফ্রিজে রাখা উচিত; দীর্ঘ সময় কক্ষ তাপমাত্রায় রেখে পরে গরম করেও সবক্ষেত্রে নিরাপদ হয় না।

সংক্রমণে আক্রান্ত হলে পর্যাপ্ত তরল ও ইলেকট্রোলাইট গ্রহণ অনেক সময় জীবন রক্ষাকর হতে পারে। পানিশূন্যতা দ্রুত অবনতি ঘটায়; তাই তরতরিয়ে পানি, সল্ট-স্যুক্রোজ ও ইলেকট্রোলাইট সমঝোতা সমাধান গুরুত্বপূর্ণ। গুরুতর লক্ষণ বা তিন দিনের বেশি স্থায়ী উপসর্গ দেখলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

দীর্ঘমেয়াদে প্রতিরোধে ব্যক্তিগত সতর্কতার পাশাপাশি পুষ্টিবিধিও গুরুত্বপূর্ণ। স্ট্যানফোর্ড মেডিক্যাল স্কুলের পুষ্টিবিষয়ক পরামর্শ অনুযায়ী ভারসাম্যবান ও বৈচিত্র্যময় খাদ্য—তাজা ফল ও শাকসবজি, পূর্ণ শস্য, চর্বিহীন আমিষ ও স্বাস্থ্যকর তেল—শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক। নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম ও সুষম পুষ্টিও গুরুত্বপূর্ণ।

সংক্ষেপে, ল্যানসেটের এই প্রতিবেদন মনে করিয়ে দেয় যে খাদ্যবাহিত রোগ একটি ব্যক্তিগত মাত্রার সমস্যা নয়; এটি একটি জনস্বাস্থ্যগত ও নীতিগত চ্যালেঞ্জ। দেশগুলোকে শক্ত কায়দায় খাদ্যনিরাপত্তা নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে হবে এবং জনগণকে সচেতন করে ঘরে-ঘরে সহজ প্রতিরোধমূলক অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে যাতে ভবিষ্যতে এই ধরণের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু এবং রোগের বোঝা কমানো যায়।