সরকার জ্বালানি সাশ্রয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট সংকট মোকাবিলায় একগুচ্ছ কঠোর ব্যয় সংকোচন ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, সরকারি-বেসরকারি অফিসের সময়সূচি পরিবর্তন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে কড়াকড়ি এবং অন্যান্য খাতে খরচ কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) রাতে জাতীয় সংসদ ভবনে প্রধানমন্ত্রী তরিক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি এসব তথ্য জানান।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, সমস্ত সরকারি ও বেসরকারি অফিস সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত কাজ করবে, অর্থাৎ অফিসের সময় এক ঘণ্টা কমে গেছে। একইভাবে, ব্যাংকগুলো সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত খোলা থাকবে এবং বিকেল ৪টায় বন্ধ হয়ে যাবে। এছাড়া, সন্ধ্যা ৬টার পর দেশের সব বাজার, দোকান, শপিংমল বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে কাঁচাবাজার, ওষুধের দোকান ও জরুরি খাবার দোকান এই নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে থাকবে। এটি কঠোরভাবে মনিটরিং করা হবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দ্বারা।
ব্যয় কমাতে সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা যেমন প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা তাদের গাড়ির জন্য মাসিক জ্বালানির বরাদ্দ ৩০ শতাংশ কম করবেন। সরকারি গাড়িতে ব্যবহারের জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের খরচও তেমনই ৩০ শতাংশ কমাতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, সরকারি আবাসিক ভবনের শোবেনর্ধন ব্যয় ২০ শতাংশ, আর অনাবাসিকের জন্য ৫০ শতাংশ হ্রাস করা হবে।
শিক্ষা ক্ষেত্রে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় আলাদ নির্দেশনা দেবে, যা সম্ভবত রোববার থেকে কার্যকর হবে। স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমাতে বলা হয়েছে এবং যানজট নিয়ন্ত্রণে শুল্কমুক্ত ইলেকট্রিক বাস আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগের আওতায়, বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও শুল্ক কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়েছে, তবে পুরনো বাস আনা যাবে না।
সরকারের বাজেট থেকে, জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের খরচ ৩০ শতাংশ হ্রাসের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আগামী তিন মাসের জন্য সরকারি নতুন গাড়ি, কম্পিউটার বা যেকোনো নতুন প্রযুক্তি সামগ্রী কেনা বন্ধ থাকবে। পাশাপাশি, সরকারি কর্মকর্তা, কর্মচারীদের বিদেশি ভ্রমণ ও অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণের ৫০ শতাংশ বন্ধ থাকবে। সভা ও সেমিনার অনুষ্ঠানে আপ্যায়নের খরচও ৫০ শতাংশ কমানো হয়েছে। জ্বালানি সংকটের এই সময়ে, অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা ও উৎসব-অনুষ্ঠানে ভর্তুকি বন্ধ এবং আর্থিক সাশ্রয় নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানির সরবরাহ কিছুটা অস্থিতিশীল হওয়ায় সরকার বিকল্প উৎসের সন্ধান করছে। ইতোমধ্যে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও কাজাখস্তান থেকে তেল আমদানির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ আরও জানায়, সাধারণ মানুষের কষ্ট লাঘবের জন্য জ্বালানি খাতে ভর্তুকি অব্যাহত থাকবে। তবে, চাপের কারণেঅভ্যন্তরীণ যাত্রা ও বৈদেশিক প্রশিক্ষণসহ অন্যান্য অনুকূল খরচ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গাড়ি কেনার জন্য সরকারি কর্মকর্তাদের সুদমুক্ত ঋণও আপাতত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যতক্ষণ না নতুন নির্দেশনা দেওয়া হয়, ততক্ষণ সরকারি কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিরা গাড়ি কেনা বা বিদেশে প্রশিক্ষণে যেতে পারবেন না। তবে, প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা সর্বোচ্চ ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিয়ে গাড়ি কিনতে পারবেন, পাশাপাশি গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ ও চালকের বেতনের জন্য মাসিক ভাতা পাবেন। এ সব সুবিধা ‘প্রাধিকারপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের সুদমুক্ত ঋণ ও গাড়ি সেবা নীতিমালা, ২০২০’ অনুযায়ী প্রদান হয়।







