নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলায় প্রতিবছর প্রায় ১০ কোটি টাকার গ্যাস অবৈধভাবে চুরি করে পরিচালিত হচ্ছে একাধিক চুনা ও ঢালাই কারখানা। স্থানীয় এলাকায় ব্যাঙের ছাতার মতো ছড়িয়ে পড়েছে এই অবৈধ প্রতিষ্ঠানগুলো, যা পরিবেশের গুরুতর ক্ষতির কারণ হিসেবে ধরা পড়ছে। অভিযোগ রয়েছে, তিতাস গ্যাসের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সহযোগিতায় এসব কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে, যা সরকারের রাজস্ব ক্ষতির পাশাপাশি পরিবেশ দুশ্চিন্তার সৃষ্টি করছে। প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে স্থানীয়রা হতাশা প্রকাশ করছেন।
স্থানীয় মানুষ জানান, পরিবেশ বিপর্যয়ের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে এই অবৈধ কারখানাগুলো বন্ধের দাবি জানানো হচ্ছে। যদিও তিতাস কর্তৃপক্ষ অবৈধ গ্যাস ব্যবহারের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর কথা বললেও বাস্তবায়নে এখনো কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
পটভূমিতে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল এলাকায় একসময় গ্যাসের মাধ্যমে পাথর গলিয়ে চুনা তৈরি হত। পরিবেশের অবনতি ও পরিবেশবান্ধব নীতিমালা মেনে কাজ করায় স্থানীয় প্রশাসন সেখানে অবৈধ কারখানাগুলো উচ্ছেদ করে। এরপর ওই কারখানাগুলো সোনারগাঁয়ের চারটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় অবৈধ গ্যাস ব্যবহার করে পুনরায় গড়ে তোলা হয়। উপজেলার পিরোজপুর, মোগরাপাড়া, কাঁচপুর, সাদিপুর ইউনিয়ন এবং সোনারগাঁ পৌরসভায় অনেকগুলো চুনা ও ঢালাই কারখানা বেআইনিভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও এই কারখানা গড়ে তোলায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তারা অভিযোগ করেছেন, বিগত ১৭ বছর ধরে বর্তমান সরকারের শাসনামলে আওয়ামী লীগের নেতারা অবৈধ গ্যাস ব্যবহার করে এসব কারখানা তৈরি করেছিল। বর্তমানে তারা পালিয়ে গেলেও তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষকে নিয়ন্ত্রণ করে এই ব্যবসা চালাচ্ছে বলে তারা দাবি করেন।
বিশেষ করে পিরোজপুর ইউনিয়নের আষাঢ়িয়ারচর এলাকায় সোনারগাঁ উপজেলার বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক আব্দুর রউফ ও তার ভাই আব্দুল জলিল অবৈধ গ্যাস ব্যবহার করে চুনা কারখানা স্থাপন করেছেন। গঙ্গানগর এলাকায় সোনারগাঁ যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আশরাফ প্রধানের ভাগিনা মো. মামুন মিয়া এম এম গার্মেন্টসের অব্যবহৃত কারখানায় সিন্ডিকেট চুনা কারখানা চালু করেছেন। পিয়ার নগর গ্রামে দুটি ঢালাই কারখানা রয়েছে। একই ভাবে ইসলামপুর, প্রতাপেরচর, পিরোজপুর, রতনপুর, সোনারগাঁ পৌরসভাসহ বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ গ্যাস ব্যবহার করে চুনা ও ঢালাই কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
এই সব অবৈধ গ্যাস ব্যবহারের কারণে বৈধ গ্রাহকরা প্রয়োজনীয় পরিমাণ গ্যাস পাচ্ছেন না, যার ফলে গ্যাস ব্যবহার করে রান্নাবান্নায় নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন তারা। পরিবেশ দুষণের কারণে আশপাশের ফসল ও ফলন কমে যাচ্ছে, যা স্থানীয় কৃষকদের জন্য বড় অসুবিধার কারণ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চুনা কারখানার মালিক জানিয়েছেন, তিতাসের কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে মিলেমিশে তারা গড়ে তোলেন এসব অবৈধ কারখানা এবং মাসোহারা প্রদান করে তাদের সহযোগিতা নিশ্চিত করেন। প্রশাসনিক অভিযান হওয়ার আগেই তারা গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম সরিয়ে নিয়ে যান, ফলে অভিযান ব্যর্থ হয়ে থাকে এবং ভাঙার কয়েকদিন পর আবারও কারখানা গড়ে তোলা হয়।
স্থানীয়রা প্রশাসনের অচলভাব ও উপেক্ষিত হওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। পিরোজপুর এলাকার আক্কেল আলী বলেন, প্রভাবশালী নেতাদের প্রভাবে এই অবৈধ কারখানাগুলো চলতে থাকে, অথচ সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা দেখছি না।
অপরদিকে সোনারগাঁ উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক আব্দুর রউফ এবং সোনারগাঁ উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আশরাফ প্রধান নিজেকে এসব অবৈধ কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখছেন, তবে অন্য বর্ষীয়ান নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। অভিযুক্ত মো. মামুন মিয়ার দাবি, গত ১৭ বছর ধরে শেখ হাসিনার শাসনামলে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এসব অবৈধ গ্যাস ব্যবহার করে কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে এবং বর্তমানে তিতাসের সাথে যোগসাজশ করে তারা এই ব্যবসা চালাচ্ছেন।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশনের উপ ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী রাজীব কুমার সাহা জানান, মন্ত্রনালয়ের বিভিন্ন সভায় অবৈধ গ্যাস ব্যবহারের বিষয় উপস্থাপন করা হয়েছে এবং এসব কারখানা ভেঙে ফেলার পরও আবার নতুনভাবে গড়ে ওঠা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। তিতাসের কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার প্রমাণ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।








