ঢাকা | মঙ্গলবার | ২রা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৯শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৬ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

হামের তাণ্ডবের মাঝে ডেঙ্গু নিয়েও সতর্কতা

দেশে হাম নিয়ে ত্রাস থামেনি; সেই পরিস্থিতির মধ্যেই নতুনভাবে চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গু। টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিপাত কিউলেক্স মশার উপদ্রব কিছুটা কমিয়েছে বলে মনে করা হলেও একই সময় আক্রামক এডিস মশার সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবারের ডেঙ্গুর ধরন ও বিস্তার জটিল হতে পারে এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর প্রভাব পড়ার শঙ্কা আছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গত পাঁচ বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশে ডেঙ্গু সংক্রমণে মোট মৃত্যুর প্রায় অর্ধেকই ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় concentrated। এর মধ্যে দক্ষিণ সিটির মৃত্যুহার তুলনামূলকভাবে বেশি।

হাম সংক্রান্ত সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, হাম উপসর্গ নিয়ে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ১,১৩৪ জন। এসব তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ০১ জুন প্রকাশিত দৈনিক বুলেটিনে জানানো হয়েছে। ১৫ মার্চ থেকে আজ পর্যন্ত হাম ও এর উপসর্গে মোট মৃত্যু দাঁড়িয়েছে ৫৮৮ জনে; এর মধ্যে ল্যাব পরীক্ষায় নিশ্চিতভাবে হাম আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৯০ শিশু, আর বাকিরা মারা গেছেন হামের উপসর্গ নিয়ে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, এই পরিসংখ্যান ৩১ মে সকাল ৮টা থেকে ০১ জুন সকাল ৮টার মধ্যে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশ করা হয়েছে। আগের দিনগুলোতে বিভিন্ন সময়ে আরও মৃত্যুর খবর জানানো হয়েছিল — গত বুধবার ও বৃহস্পতিবার পাঁচজন করে এবং গত মঙ্গলবার ১০ জনের মৃত্যুর তথ্য প্রকাশ করা হয়েছিল। একই সময়ে, ১৫ মার্চ থেকে পরীক্ষায় নিশ্চিত হামের রোগীর সংখ্যা কোটি নয়—নির্দিষ্টভাবে ৯ হাজার ৯৪ জন এবং হাম উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া রোগীর সংখ্যা ৫৭ হাজার ৯০২ জন বলে বুলেটিনে জানানো হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আশ্বস্ত করেছে যে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে তাদের নজরদারি ও চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রয়েছে।

হাসপাতালে দাঁড়িয়ে ছবিটা ভয়াবহই: গত সোমবার বেলা দেড়টার দিকে মহাখালীর ডিএনসিসি কোভিড‑১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতালে গেলে দেখা গেছে অনেক হাম রোগী সেখানে চিকিৎসাধীন। কুমিল্লার ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে আসা শিল্পী লিপি আক্তারের কাহিনী তারই এক উদাহরণ। তিনি ২২ মে থেকে অসুস্থ হয়ে পড়েন; প্রথমদিন পরিবারই সাধারণ জ্বর ভেবে তিন দিন স্থানীয় ময়নামতি জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা নেন। কিন্তু অবস্থা না বদলে পরে লিপিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়—সেখান থেকে সংক্রামক রোগ হাসপাতালে এবং পরে ২৯ মে DNCC হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে তাকে চার দিন আইসিইউতে রাখা হয়; পরে কিছুটা সুস্থ হয়ে চতুর্থ তলার সাধারন ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়। লিপি আক্তার জানান, “কখনো এ রকম হাম হবে ভাবিনি। করোনার মতো ভয়াবহ; আত্মীয়স্বজন কেউ কাছে আসতে পারছিল না, সবাইকে দূরত্ব বজায় রাখতে হয়েছে।”

লিপি আক্তারের পাশাপাশি গাজীপুরের রহিমা আক্তার (৪০), নরসিংদীর মাহমুদুল হাসান (৩২) সহ প্রাপ্তবয়স্ক অন্তত ৪৪ জন বর্তমানে ওই হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।

ডেঙ্গু নিয়েও আশঙ্কা বাড়ছে: হামের অস্থিতির মাঝেই একদিনে ডেঙ্গুতে একজনের মৃত্যু এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১১০ জন রোগী। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিনে বলা হয়েছে, গত এক দিনে ঢাকা উত্তর সিটির হাসপাতালে ১ জন ও ঢাকা দক্ষিণ সিটির হাসপাতালে ১২ জন ভর্তি হয়েছেন। সিটি করপোরেশনের বাইরে ঢাকা বিভাগে ১৫ জন, বরিশালে ৩৫ জন, চট্টগ্রামে ১২ জন, খুলনায় ২১ জন, ময়মনসিংহে ৮ জন, রাজশাহীতে ৫ জন এবং সিলেটে ১ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া একমাত্র ডেঙ্গু রোগীটি খুলনা বিভাগের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

চলতি বছরের প্রাথমিক পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরের তুলনায় এ বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা কিছুটা কম। মার্চ ও এপ্রিল মাসে কোনো মৃত্যু হয়নি; জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে প্রতিটি মাসে দুজন করে এবং মে মাসে একজনের মৃত্যু হয়েছে। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালে ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছিল নভেম্বর মাসে—সেই মাসে একা ১০৪ জন মারা গিয়েছিলেন।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগও উঠেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার বলছেন, টানা বৃষ্টি ও আর্দ্রতা এডিস মশার প্রজননের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। তার পূর্বাভাস, এবারের ডেঙ্গুর ঢেউ ২০২৩ সালের মতো অতটা ভয়াবহ নাও হতে পারে; তবু গত বছরের তুলনায় প্রাদুর্ভাব ও বিস্তার বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

স্বাস্থ্যকর্মীদের নজরদারি ও সাধারণ মানুষের সজাগতা এখন অত্যন্ত জরুরি—ডেঙ্গু ও হাম একসঙ্গে বিধ্বংসী চাপ সৃষ্টি করলে স্বাস্থ্যব্যবস্থা আরও টানাপোড়েনে পড়তে পারে। নাগরিকদের বাড়ির আশেপাশে পানি জমতে দিতে না দেওয়া, মশার লার্ভা নিধনে তৎপর থাকা এবং কোনও অনুকূল লক্ষণ দেখা মাত্র স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দ্রুত যোগাযোগ করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।