ঢাকা | শনিবার | ২৫শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১০ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১১ই সফর, ১৪৪৮ হিজরি

হাম রোগে মৃত্যু বাড়ছে, শিশুরা ঝুঁকিতে

হাম এবং তার উপসর্গে মৃত্যুর মিছিল অব্যাহত রয়েছে। সাম্প্রতিক הנתונים বলছে, আরও পাঁচ শিশু হাম ও তার উপসর্গে মারা গেছে। এ সময়ে নতুন করে আরও ১,১৩৭ শিশুর শরীরে হাম ও তার উপসর্গ দেখা গেছে। ফলে গত ১৫ মার্চ থেকে ২৪ জুলাই পর্যন্ত সন্দেহজনক হামরোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক লাখ ২২ হাজার ১৫০ জনে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে জানানো হয়, নতুন করে ১৮৭ জনের রোগ নিশ্চিত হওয়ায় বর্তমানে নিশ্চিত হামরোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ১৯৪। এছাড়া সন্দেহজনক হাম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এক লাখ ৪ হাজার ৭১৭ জন, এবং সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছাড়পত্র পেয়েছেন এক লাখ এক হাজার ৫৬ জন। এর মধ্যে, এই সময়ের মধ্যে হামরোগের কারণে মোট ৭১৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

সংক্রমণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারের নেওয়া হাম-রুবেলা টিকা কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এই টিকা কর্মসূচি ২০২৬ সালের এপ্রিলে শুরু হয় এবং পর্যায়ক্রমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে শুরু করে পুরো দেশে চালু করা হয়। লক্ষ্য ছিল ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী এক কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনা। সরকারের দাবি, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি শিশু টিকা পেয়েছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, তবে এই লক্ষ্যমাত্রা ঠিকই ছিল, কিন্তু তা প্রকৃত শিশুসংখ্যার তুলনায় কম। জুনে অনুষ্ঠিত ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইনে প্রায় ২ কোটি ২৬ লাখ শিশু অংশ নেয়। এর মানে, বর্তমানে প্রায় ৪৬ লাখ শিশু হয়তো এই টিকাদান থেকে বাদ পড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই রোগের বিস্তার ও টিকাদানের পরও সংক্রমণ কমছে না কারণ, এর প্রধান কারণ হলো প্রতিরোধের ঘাটতি। বর্তমানে দেখা গেছে, মোট মৃত্যুর ৮০ শতাংশই ঘটে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর মধ্যে। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় উঠে এসেছে, হাম রোগে ভর্তি হওয়া বেশিরভাগ শিশুই আগে হামের টিকা পায়নি।

এছাড়া, আইসিডিডিআর,বি এবং অন্যান্য গবেষকদের বিশ্লেষণে জানা গেছে, এপ্রিল-মে মাসে চিকিৎসা নেওয়া ৩৪১ শিশুর মধ্যে যারা মারা গেছে, তাদের মধ্যে ৫২ শতাংশ ছিল বয়স ছয় মাসের কম। অর্থাৎ, তারা নিয়মিত ভ্যাকসিনের সময়সূচি শেষ হওয়ার আগেই আক্রান্ত হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য বলছে, প্রাদুর্ভাবের মধ্যে আক্রান্ত শিশুর মধ্যে প্রায় চার ভাগই বয়স পাঁচের কম।

চিকিৎসকদের পরামর্শ, টিকা না পাওয়া ও অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের জন্য হামজনিত মৃত্যুর অন্যতম কারণ হলো নিউমোনিয়া। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা সংগ্রহে জটিলতা ও ঠিকা কার্যক্রমের দুর্বলতা এই পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলছে।

একটি বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা কেনার নতুন পদ্ধতি চালুর পর থেকে সরবরাহে বিলম্ব ঘটে, যা হামের পুনরুত্থানে অবদান রাখে।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ রিয়াজ মোবারক বলেন, “টিকাদান কর্মসূচির দুর্বলতা এই সংকটের মূল কারণ। অনেক মা-ই নিজে হামের টিকা না পেয়ে তাদের নবজাতকরা প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।” তিনি দ্রুত টিকাদানের অগ্রাধিকার বাড়ানোর, রোগের পর্যবেক্ষণ জোরদার করার, গবেষণা সম্প্রসারণের এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে রোগপ্রতিরোধের ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যথায়, বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় হাম প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা কঠিন হয়ে পড়বে।