ঢাকা | বৃহস্পতিবার | ৩০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৩ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

হৃদয়কে ফিরে পেতে বছরজুড়ে মায়ের প্রতীক্ষা

মায়ের চোখ আজো একটুকরো আশায় পথ দেখছে—হয়তো ফিরবে হৃদয়, হয়তো আবার ‘‘মা’’ বলে ডাকবে।

গত বছরের ৫ আগস্ট ছিল দেশের এক গুরুত্বপূর্ণ দিন। গণঅভ্যুত্থান ও সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে রাজপথে জয়িতদের উল্লাসের আবহ ছিল ব্যাপক। সেই বিকেলে গোপালপুর উপজেলার আলমনগরের কলেজছাত্র হৃদয়কে গাজীপুরের কোনাবাড়ীতে শরিফ মেডিক্যাল হাসপাতালের সামনের বিজয় মিছিল থেকে ১০-১২ জন পুলিশ সদস্য ঘিরে ধরে হামলা চালায়। বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি ছুড়ে তাঁকে আটক করে পুলিশ। ছিঁড়ে যাওয়া রক্তাক্ত দেহ মাটিতে পড়ে থাকতে দেখে প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও পুলিশ তাকে টেনে নিয়ে যায়। সে নির্মম ঘটনার ভিডিও মুহূর্তেই সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে মানুষের হৃদয় ভাইর করেছিল।

হৃদয় হেমনগর ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র ও পরিবারের একমাত্র সন্তান ছিলেন। লেখাপড়ার খরচ চালাতে গাজীপুরে অটোরিকশা চালাত সে। কিন্তু ৫ আগস্টের বিকাল থেকেই তার কোনও খোঁজ মেলেনি। তার মা রেহেনা বেগম আজও ছেলে ফিরে আসার প্রতীক্ষায় আছেন। অন্তত হাড়গোড় পাওয়া গেলেও, বাড়ির উঠোনেই ছেলে সমাধিস্থ করার আশা রেখেছেন দিনমজুর বাবা লালমিয়া। যদিও বৃদ্ধ বাবার ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করলেও শোকে তিনি আর সঠিকভাবে কাজ করতে পারছেন না। এনজিও ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় পরিবারটি আর্থিকভাবে আরও সংকটে পড়েছে।

এই ঘটনার জেরে হৃদয়ের ভগ্নিপতি মো. ইব্রাহীম কোনাবাড়ী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। তিনি জানান, ৫ আগস্ট সকালে হৃদয় ও তিনি আন্দোলনে অংশগ্রহণ করছিলেন। শেখ হাসিনার দেশে প্রত্যাবর্তনের পর সকলেই আনন্দ মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন। মিছিলটি যখন কোনাবাড়ী থানার কাছে পৌঁছায়, তখন থানার ভিতর থেকে পুলিশ গুলি ছুড়ে। পরে পুলিশ একটি দল শরিফ মেডিক্যাল হাসপাতালের সামনে হৃদয়কে ঘিরে ধরে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি চালায় এবং তার লাশ গুমের উদ্দেশ্যে টেনে নিয়ে যায়, শেষ পর্যন্ত থানা পার্শ্ববর্তী একটি বেঞ্চের আড়ালে লুকিয়ে রাখে। এই ঘটনাগুলো নিয়েও একাধিক ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

মামলার বাদী ইব্রাহীম বলেন, এক বছর পর সরকার নিহতের লাশ উদ্ধারে তুরাগ নদীতে কাজ করেছে। ‘‘যদি আমার ভাইয়ের একটা হাড়ও পাই, তবে তা নিয়ে পরিবারের সবাইকে সান্ত্বনা দিতে পারব এবং বাড়ির পাশে একটি কবর দিতে পারব।’’

হৃদয়ের বড় বোন জেসমিন আক্তার বলছেন, ‘‘অভাবের সংসারে হৃদয় কষ্ট করে পড়াশোনা করত। লাশ না পাওয়ায় আমার ভাই শহিদের মর্যাদা পায়নি। সরকার থেকে কোনো সহযোগিতা পাইনি আমরা।’’

হৃদয়ের মায়ে-বাবা কাঁদতে কাঁদতে দাবি জানিয়েছেন, ‘‘আমরা শুধু আমাদের ছেলের হাড়-গোড় ফিরে চাই। যারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি—ফাঁসি চাই।’’

বর্ষব্যাপী প্রতীক্ষার এ যন্ত্রণা যেনো যেন দ্রুত মুকুট পায় নিষ্পাপ সেই মায়ের মুখ থেকে। হৃদয় ছাড়া ঘর যেন এক পূর্ণতা হারিয়েছে, আর তার বাড়ির উঠোন চায় মায়ের অপেক্ষায় অবসান।