ঢাকা | সোমবার | ৪ঠা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৭ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

২৪ জুলাই ‘২৪: চিরুনি অভিযানে ১,৪০০ গ্রেফতার, সারাদেশে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট চালু

কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা চলতে থাকায় ২০২৪ সালের ২৪ জুলাই (বুধবার) আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ‘চিরুনি অভিযান’ অব্যাহত রাখে। টানা পঞ্চম দিন হলেও এদিন সারাদেশে কারফিউ কিছুটা শিথিল করা হয়।

২৪ জুলাই সারাদেশে মোট প্রায় ১,৪০০ জন আন্দোলনকারী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী গ্রেফতার করা হয়। এর মধ্যে ঢাকায় গ্রেফতার হন ৬৪১ জন। গত ৮ দিনে (১৭ থেকে ২৪ জুলাই) সারাদেশে মোট গ্রেফতারের সংখ্যা পৌঁছেছে প্রায় সাড়ে চার হাজারে। রাজধানীতে মোট ১,৭৫৮ জন, চট্টগ্রামে ৭০৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃতদের বেশিরভাগই বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মী, যা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।

তৎকালীন ডিবি প্রধান ও ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ জানান, ভিডিও ফুটেজের মাধ্যমে দুষ্কৃতকারীদের শনাক্ত করে তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে।

২৪ জুলাই রাতে বিটিআরসি পরীক্ষামূলকভাবে সারাদেশে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট পুনরায় চালু করে, যদিও মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হয়। হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত মেট্রোরেল ও ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বন্ধ ছিল এবারও।

কোটা আন্দোলনকারীদের সমন্বয়ক হিসেবে পরিচিত আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, আবু বাকের মজুমদার ও রিফাত রশীদের খোঁজ পাওয়া যায়। নিখোঁজ হওয়ার পাঁচ দিন পর আসিফ ও বাকেরকে চোখ বাঁধা অবস্থায় রেখে ফেসবুকে তাদের উদ্ধার হওয়া জানানো হয়।

ঢাকার বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষের সময় আহত হয়ে হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাধীন ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। ঢামেক হাসপাতালে ৩ জন এবং সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১ জন মারা যান।

এ পর্যন্ত কোটা সংস্কার আন্দোলনের বিক্ষোভ ও গতিতে সংঘাতে ২০১ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে হাসপাতাল, স্বজন ও গণমাধ্যম থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে।

২৪ জুলাই ঢাকাসহ তিন জেলায় সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কারফিউ শিথিল ছিল। অন্যান্য জেলাগুলোতেও জেলা প্রশাসকের নির্দেশনায় চলকালীন সময়ে কারফিউ কিছু সময়ের জন্য শিথিল করা হয়। সরকারি অফিস ও ব্যাংক চার ঘণ্টার জন্য লঞ্চ হয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব ও সেনাবাহিনী টহল দেয়। এদিন দেশের শীর্ষস্থানীয় সাংবাদিকরা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে মতবিনিময় সভায় অংশ নেন।

কারফিউ শিথিলের কারণে রাজধানী থেকে বিভিন্ন দূরপাল্লার বাস চলাচল শুরু হয় এবং ঢাকা নদীবন্দর থেকে লঞ্চ সার্ভিস চালু হয়। অফিস, আদালত ও কলকারখানায় কর্মচাঞ্চল্য ফিরে আসে।

অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের প্রধান স্থাপনাগুলো সরকারের উদ্যোগে বিদেশি কূটনীতিকদের সরেজমিনে প্রদর্শন করা হয়। তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ জানান, মোট ৪৯টি মিশনের প্রতিনিধিসহ ২৩ জন রাষ্ট্রদূত এসব ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থাপনা পরিদর্শন করেছেন।

কোটা আন্দোলনে ১৬ জুলাই নিহত ৬ জনের ঘটনায় ২৪ জুলাই বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশনের প্রথম বৈঠক হয়। গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জনসাধারণ থেকে তথ্য সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তদন্ত কমিটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করবে।

নিহত আটজনের পরিচয় শনাক্ত করতে না পারায় ঢামেক মর্গে থাকা মরদেহগুলো বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়।

এ বিষয়ে পুলিশের তৎকালীন মহাপরিদর্শক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘‘দুষ্কৃতকারীরা যেখানেই থাকুক না কেন, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’’

তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানান, ‘‘জনমানসে স্বস্তি না ফেরা পর্যন্ত কারফিউ চলবে।’’

নরসিংদী কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া দুই নারী ‘জঙ্গি’ ইশরাত জাহান মৌসুমী ওরফে মৌ এবং খাদিজা পারভীন মেঘলাকে গ্রেফতার করা হয়। এছাড়া পালিয়ে যাওয়া কারাবন্দিদের মধ্যে ২৯২ জন আত্মসমর্পণ করেছেন।

২৪ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা চার দফা দাবিতে সারাদেশে অবিলম্বে ইন্টারনেট চালু ও কারফিউ প্রত্যাহারের আল্টিমেটাম দেন। অন্যদিকে, তাদের অন্তর্ভুক্ত একটি পক্ষ ডিসেম্বর মাসে ৯ দফা দাবিতে গণসংযোগ কর্মসূচি ঘোষণা করে।

মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা বাংলাদেশের পরিস্থিতি মনিটর করছে এবং সকলকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জানিয়েছেন, আইন-শৃঙ্খলা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে এবং সরকার যতদিন চাইবে, সেনাবাহিনী বেসামরিক প্রশাসনের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নতুন সেমিস্টারের ভর্তি পরীক্ষা ও বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের বিভিন্ন পরীক্ষা ৩১ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত রাখা হয়। এতে ৪৪তম বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষা, অর্ধবার্ষিক বিভাগীয় পরীক্ষা ও অন্যান্য পরীক্ষাগুলো অন্তর্ভুক্ত।