ঢাকা | বুধবার | ২৭শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৩ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১০ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

৭৯তম কান উৎসবে রোমানিয়ার ‘ফিওড’ পেল স্বর্ণপাম

৭৯তম কান চলচ্চিত্র উৎসবের প্রধান পুরস্কার স্বর্ণপাম জিতে নিয়েছেন রোমানিয়ান পরিচালক ক্রিশ্চিয়ান মুঙ্গিউর নতুন ছবি ‘ফিওড’। উৎসবের সমাপনী রাতে শনিবার প্রধান জুরি সভাপতি পাক চান-উক এই বাৎসরিক সম্মাননা ঘোষণা করেন। মুঙ্গিউ এর আগে ২০০৭ সালে ‘৪ মাস, ৩ সপ্তাহ ও ২ দিন’ ছবির জন্য একই সম্মান পেয়েছিলেন; এবার তিনি দ্বিতীয়বারের মতো স্বর্ণপাম জয়ের কৃতিত্ব নাগালে আনলেন।

পুরস্কার গ্রহণের সময়ে মুঙ্গিউ ‘ফিওড’-কে সহনশীলতা, অন্তর্ভুক্তি ও সহমর্মিতার গল্প হিসেবে বর্ণনা করেন এবং এসব মানবিক মূল্যবোধ বাস্তবে প্রয়োগের তাৎপর্য তুলে ধরেন। দর্শক এবং সমালোচকের প্রতিক্রিয়ায় দেখা গেছে ছবিটি কেবল গল্প বলেই থামেনি—এটি উদার সমাজের ছদ্মভাব এবং ব্যক্তি বনাম রাষ্ট্রের জটিল সম্পর্ককে জোরালোভাবে প্রশ্ন করেছে।

‘ফিওড’ এর গল্প ঘোরায় নরওয়ের এক ছোট গ্রামে নতুন জীবনের শুরু করা একটি রোমানিয়ান পরিবারকে কেন্দ্র করে। ধর্মীয়ভাবে রক্ষণশীল এই পরিবারের বিরুদ্ধে হঠাৎ শিশুর ওপর নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে এবং রাষ্ট্র তাদের সন্তানদের হেফাজতে নিয়ে নেয়। ছবিটি নরওয়েজিয়ান সমাজের প্রগতিশীল চেহারার আড়ালে লুকানো তিক্ত দ্বন্দ্ব ও প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানের চাপকে সূক্ষ্মভাবে ফুটিয়ে তোলে। সেবাস্টিয়ান স্ট্যান ও রেনাতে রেইনসভে অভিনীত এই ছবিটি প্রদর্শনী কালে হলের দর্শকদের মধ্যে তীব্র আবেগ ও ক্ষোভ জাগায়।

দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পুরস্কার গ্রাঁ প্রি জিতেছে রুশ নির্মাতা আন্দ্রেই জভিয়াগিনতসেভের ‘মিনোটর’। রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসনের প্রেক্ষাপটে নির্মিত এই ছবিটি একজন নির্মম ব্যবসায়ীর পারিবারিক সংকটকে খতিয়ে দেখে। ফ্রান্সে নির্বাসিত অবস্থায় পুরস্কার গ্রহণকালে পরিচালক দর্শকদের কাছে ইউক্রেন যুদ্ধের রক্তপাত বন্ধের আহ্বান জানান, যা উপস্থিতদের আবেগঘন করে তোলে।

এবার অভিনয়ে যৌথ পুরস্কারের প্রথা চোখে পড়ে। রিউসুকে হামাগুচির ‘অল অব আ সাডেন’ সিনেমার জন্য সেরা অভিনেত্রী হিসেবে সম্মান ভাগাভাগি করে নেন তাও ওকামোতো ও ভার্জিনি এফিরা। সেরা অভিনেতার পুরস্কারও যৌথভাবে দেওয়া হয়েছে লুকাস দন্তের ‘কাওয়ার্ড’ ছবির দুই অভিনেতা মাক্কিয়া ও ভ্যালোঁতাঁ কাম্পানিকে।

পরিচালনা ও অন্যান্য বিভাগেও বৈচিত্র্য দেখা গেছে: ভ্যালেস্কা গ্রিসবাখ ‘দ্য ড্রিমড অ্যাডভেঞ্চার’ জন্য জুরি পুরস্কার পেয়েছেন। সেরা পরিচালকের স্বীকৃতি পেয়েছেন পাওয়েল পাভলিকোভস্কি এবং স্প্যানিশ জুটি হাভিয়ের আমব্রোসি ও হাভিয়ের কালভো যৌথভাবে এই পুরস্কার ভাগাভাগি করেছেন। ইরানের রাজনৈতিক দমন-পীড়নের ওপর নির্মিত পেগাহ আহাঙ্গারানির ‘রিহার্সালস ফর আ রেভোল্যুশন’ সেরা প্রামাণ্যচিত্রের পুরস্কার অর্জন করেছে।

এক ইতিহাসগাথা মুহূর্তে, রুয়ান্ডার প্রথম কর্পোরেট মাত্রার ছবি হিসেবে মেরি-ক্লেমেন্টিন দুসাবেজাম্বোর ‘বেন ইমানা’ ক্যামেরা দ’অর বা সেরা প্রথম চলচ্চিত্রের পুরস্কার জিতেছে; পরিচালক এই জয়টি তিনি তার দেশের নারীদের উৎসর্গ করেছেন।

এবারের কান উৎসব কেবল পুরস্কার অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ ছিল না—এটি নারীদের প্রতিনিধিত্বহীনতা, প্রযুক্তির ব্যবহার ও চলচ্চিত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার রোলে নিয়ে তীব্র আলোচনা ও বিতর্কের ক্ষেত্রও ছিল। মূল প্রতিযোগিতার ২২ টি ছবির মধ্যে মাত্র পাঁচটি ছিল নারী নির্মাতাদের কাজ, যা নিয়ে মঞ্চে জিনা ডেভিসসহ অনেকে সংশয় প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে হলিউডের বড় স্টুডিওগুলোর অনুপস্থিতি এবং এআই প্রয়োগ সম্পর্কে নানা প্রশ্ন উঠেছে।

উৎসব গত ১২ মে থেকে শুরু হয়ে শেষ হয়েছে এবং এর পোশাকি মর্যাদার সঙ্গে—জনপ্রিয় অভিনেতা জন ট্রাভোল্টা ও কেট ব্ল্যানচেট সহ অনেক তারকাও উপস্থিত ছিলেন। তবুও এবারের আসরের মূল আকর্ষণ ছিল সারা বিশ্বের জীবনমুখী, রাজনৈতিকভাবে সচেতন ও স্বাধীন নির্মাতাদের কাজ, যারা দর্শককে চিন্তাভাবনায় যুক্ত করতে পেরেছে।