চলতি মৌসুমের শেষ দিকে মেহেরপুর জেলার আম চাষে অজানা এক পচন রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে, যা আম চাষি ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। পরিপক্ব আম গাছ থেকে সংগ্রহের মাত্র ২-৩ দিনের মধ্যে ডাঁটুর দিক থেকে আম পচতে শুরু করে, ফলে আম দ্রুত খাওয়ার অনুপযুক্ত হয়ে যাচ্ছে।
জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মেহেরপুর জেলায় মোট ২৩৬৬ হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয় এবং এ বছর আমের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৫,৫১০ মেট্রিক টন। তবে যদি মাত্র এক হাজার মেট্রিক টন আমও পচে যায়, তাহলে প্রতি মনের দাম ১৫০০ টাকা ধরা হলে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় দেড়শ কোটি টাকা।
কৃষি বিভাগ এই রোগটিকে ছত্রাকজনিত ‘স্টেম-এন্ড রট’ রোগ হিসেবে শনাক্ত করেছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সামসুল আলম জানান, ‘‘গাছে থেকেই এমন পচন আরম্ভ হচ্ছে যা আগে কখনো এ অঞ্চলে দেখেনি।’‘ তিনি আরও বলেন, আম সংগ্রহের অন্তত ১৫ দিন আগে গাছে ওষুধ প্রয়োগ বন্ধ রাখার পরামর্শ দেয়া হয়। তবে এখনো কেউ লিখিতভাবে অভিযোগ না দেওয়ায় কারিগরি টিম মাঠে পাঠানো হয়নি।
আম চাষিদের কথা থেকে জানা যায়, ‘সপ্তাহ খানেক ধরে গাছ থেকে আম সংগ্রহের দুই দিন পর আম পচে যাচ্ছে। কেউ কেউ মনে করছেন এটি আবহাওয়াজনিত ভাইরাস বা ছত্রাকের সংক্রমণের কারণে হয়ে থাকতে পারে।’
বাজার এবং বাড়িতে আম কিনে নিয়ে গেলে প্রায় দুই দিনের মধ্যেই আম পচন শুরু হয়, যা অনেককে আম ফেলে দেওয়ার জন্য বাধ্য করছে। শিখা বেগম, গড়পাড়া এলাকা বাসিন্দা, বলেন, ‘‘বাজার থেকে হিমসাগর আম কিনেছিলাম, মাত্র দু’দিনেই তা পচে গিয়ে নষ্ট হয়ে গেল, শেষ পর্যন্ত ডাস্টবিনে ফেলে দিতে হয়েছে।’‘
জেলার গাংনী উপজেলার নিশিপুর গ্রামের আম বাগান মালিক হোসেন আলী জানান, ‘‘আম গাছে থাকা অবস্থায় গায়ে কালো আবরন পড়ছে এবং আম পাড়ার পর দুই-তিন দিনের মধ্যে তা পচে যাচ্ছে। আগের মতো আম বিক্রি করে ভালো দাম পাওয়ার আশা ছিল, কিন্তু এবার আম পচে সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।’’
আম ব্যবসায়ী সিহাব জানান, ‘‘অবস্থাটি অত্যন্ত সংকটজনক। আমরা বাগান মালিকদের কাছ থেকে আম সংগ্রহ করে বাজারে বিপণন করি। বর্তমানে হিমসাগর, ন্যাংড়া, আম্রপালি প্রভৃতি আম পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু এক থেকে দুই দিনের ভেতর আম পচে যাচ্ছে, যা ব্যবসা ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।’‘
ক্রেতারা জানাচ্ছেন, পাকা এবং কাঁচা আম কিনলেই কিছু দিনের মধ্যেই আম পচে যাচ্ছে, যা ভোক্তাদেরও হতাশ করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই রোগের দ্রুত সঠিক নির্ণয় এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে পরবর্তী মৌসুমগুলিতেও আম উৎপাদনে বড় ধাক্কা আসবে। এজন্য মাঠ পর্যায়ে নজরদারি বৃদ্ধি, কৃষকদের প্রশিক্ষণ এবং সচেতনতা কর্মসূচি গ্রহণ অপরিহার্য। বিশেষ করে মেহেরপুরের হিমসাগর আম যেহেতু বর্তমানে জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে, তাই দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলেই আম রপ্তানির ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।







