ইরাকভিত্তিক ইরানি কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘খাবাত অর্গানাইজেশন’-এর সেক্রেটারি জেনারেল বাবাশেখ হোসেইনি বলেছেন, ইরানে স্থল অভিযান চালানোর সম্ভাবনা বর্তমান পরিস্থিতিতে শক্ত হয়ে উঠছে। আল-জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান—এমন কোনো আক্রমণ এখনই চলছে না, তবে দীর্ঘ সময় ধরে এর পরিকল্পনা চলছে এবং পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে শীঘ্রই পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।
হোসেইনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারী ও কুর্দি চ্যানেলের মাধ্যমে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। সরাসরি বৈঠক না হলেও ওয়াশিংটন ইরানি শাসনব্যবস্থা মোকাবিলা ও সম্ভাব্য সহযোগিতা নিয়ে কুর্দি প্রতিনিধিদের মাধ্যমে মতামত জানতে চাইছে। তিনি জানান, এসব যোগাযোগ চলছে এবং কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে।
অন্য দিকে কুর্দি নেতারা নিজস্বভাবে অভিযানের প্রস্তুতি নিয়েছে বলে জানিয়েছে—যদি প্রয়োজন হয়, सिल উনিট ইরানে পাঠানো হবে। তবে হোসেইনি স্বীকার করেন তাদের অস্ত্রশস্ত্র খুবই সাধারণ, পুরনো ও সীমিত। আধুনিক যুদ্ধযন্ত্র—ড্রোন, উন্নত বিস্ফোরক ও সমরাস্ত্র—না থাকায় মাঠপর্যায়ে বড় কোনো পরিবর্তন আনা কঠিন। তাই ভবিষ্যতে যদি যুক্তরাষ্ট্রের মতো কোনো শক্তির সঙ্গে সরাসরি সহযোগিতা গড়ে ওঠে, তাদের প্রধান দাবি হবে আধুনিক অস্ত্রগত সহায়তা।
এই উত্তেজনার মধ্যে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পস (আইআরজিসি) কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তাসনিম নিউজের বরাতে আল-জাজিরা জানিয়েছে, আইআরজিসি শনিবার সকালে ইরাকের কুর্দি অধ্যুষিত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে কুর্দিদের তিনটি অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে এবং বিবৃতিতে বলেছে—কুর্দিরা যদি ইরানের আঞ্চলিক অখণ্ডতার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়, তাদের ‘গুঁড়িয়ে’ দেওয়া হবে।
কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সরবরাহ নিয়ে ভাবছে; এমন কথাও উঠেছে যে সিআইএ কুর্দিদের মাধ্যমে ইরানে অস্ত্র পাঠানোর পরিকল্পনা করছিল। তবে হোয়াইট হাউস এই অভিযোগকে খণ্ডন করে বলেছে তারা কুর্দিদের দিয়ে ইরানে বিদ্রোহ শুরু করানোর কোনো আনুষ্ঠানিক পরিকল্পনা করছে না। অতীতের বিবরণে বলা হয়—কুর্দিদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের; সহযোগিতা হয়েছে কিন্তু পরে তাদের ত্যাগ করার অভিযোগও আছে।
কুর্দিরা মধ্যপ্রাচ্যের একটি বৃহৎ জাতিগোষ্ঠী, সংখ্যা আনুমানিক ৩–৪ কোটির কাছাকাছি। তাঁরা প্রধানত ইরান, ইরাক, সিরিয়া ও তুরস্কে ছড়িয়ে আছে এবং দীর্ঘদিন ধরে স্বায়ত্তশাসন বা স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবি করে আসছে। ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে তাঁদের ঘনবসতি, গত কয়েক বছরে রাজনৈতিক সক্রিয়তা বাড়ায় নজর কাড়ছে—বিশেষত ২০২২ সালে মাশা আমিনির মৃত্যুর পর ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলন কুর্দি এলাকায় তীব্র প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করেছিল।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন—ইরানের বিরুদ্ধে দ্রুত ও সফল সশস্ত্র বিদ্রোহ গড়ে তোলা সহজ নয়। ইরানীয় কুর্দিরা আইরাক বা সিরিয়ার কুর্দিদের তুলনায় আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সংযোগ ও সামরিক অভিজ্ঞতায় পিছিয়ে রয়েছে। নতুন যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, সংগঠন গঠন ও সামরিক সক্ষমতা তৈরি করতে সাধারণত মাস নয় বরং বছরগুলো লাগে। তাই তাত্ক্ষণিকভাবে বড় ধরনের সাফল্য আশা করা বাস্তবসম্মত নয়।
সম্প্রতি উত্তর ইরাকে পাঁচটি কুর্দি সংগঠন ঐক্যফ্রন্ট গঠনের ঘোষণা দিয়েছে—তাদের লক্ষ্য ইরানের ইসলামিক শাসনব্যবস্থার অবসান এবং কুর্দিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। এই জোটে কুর্দিস্তান ডেমোক্র্যাটিক পার্টি ও ফ্রি লাইফ পার্টি অব কুর্দিস্তানের মতো শক্তিশালী সংগঠন দুটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—উভয়েরই নিজস্ব সশস্ত্র শাখা আছে। তবে এক্ষেত্রে বড় বাধা হলো—কুর্দিস্তান আঞ্চলিক সরকারের (কেআরজি) কঠোর শিক্ষাবোধ; তারা জোর দিয়েছেন যে তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে কোনো সামরিক অভিযান চালানো হবে না, কারণ অতীতে এমন কর্মকাণ্ডের জবাবে ইরান ওই অঞ্চলে গোলাবর্ষণ করেছিল।
সংক্ষेपে বলা যায়, ইরান-কুর্দি সংকটের মৌলিক ভূমিকায় আছে দীর্ঘ ইতিহাস, সীমিত সামরিক সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়াভূমি। বর্তমানে উত্তেজনা বাড়লেও বাস্তবে বড় কোনো স্থল অভিযান বা সফল বিদ্রোহ গড়ে তোলার জন্য কুর্দিদের সময়, আধুনিক সরঞ্জাম এবং বহুমুখী আন্তর্জাতিক সাহায্যের প্রয়োজন হবে। পরিস্থিতি ক্লান্তিকরভাবে পরিবর্তনশীল; কারও পক্ষেই এগুলি এখনই চূড়ান্ত বলা কঠিন।







