ঢাকা | শনিবার | ১১ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৭শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২৬শে মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

উজানের ঢল ও ভারি বর্ষণে পাঁচ জেলায় বন্যা; আরও পাঁচ জেলা ঝুঁকিতে

সক্রিয় মৌসুমি বায়ু ও উজানের ভারি বৃষ্টিপাতে দেশের বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বাড়ায় নতুন করে পাঁচ জেলায় বন্যা সৃষ্টি হয়েছে, একই সঙ্গে আরও পাঁচ জেলা ঝুঁকিতে রয়েছে। শুক্রবার (১০ জুলাই) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সর্বশেষ রিপোর্টে এই তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের প্রভাব এখনও বজায় থাকায় উত্তর-পূর্ব ও পূর্বাঞ্চলের অনেক নদীর পানিই দ্রুত বাড়ছে। এতে সিলেট, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য এলাকার কিছু স্থানে স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। কেন্দ্রটি নদী সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার, পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করার ও স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার অনুরোধ করেছে।

চট্টগ্রাম: প্লাবিত উপজেলায় পানিবন্দি সাড়ে সাত লাখ

চট্টগ্রামে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে জেলার কয়েকটি উপজেলা প্লাবিত হয়েছে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী শুক্রবার (১০ জুলাই) পর্যন্ত ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবার, মোট ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৫৯০ জন মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত। জেলায় মোট ১৭৬টি ইউনিয়ন প্রভাবিত হয়েছে। এ দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১০ জন নিহত এবং ১০ জন আহত হয়েছে।

সাতকানিয়া উপজেলায় সবচেয়ে বেশি ভূমি প্লাবিত হয়েছে; উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার গ্রামগুলো পানির নিচে আছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পৌরসভাসহ অনেক স্থানে পানি নামা শুরু করলেও কোথাও কোথাও পানি অন্য দিকে গিয়ে জমে পরিস্থিতি জটিল রয়েছে। বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও ইন্টারনেট-সিগন্যাল বিচ্ছিন্নতার রিপোর্টও পাওয়া যাচ্ছে।

বাঁশখালীতে রাস্তা কেটে পানি নামানোর কাজ চলছে; সেখানে উপজেলা প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ত্রাণ কাজ করা হচ্ছে। জেলা ত্রাণ কার্যালয় জানিয়েছে, দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলায় ৭০০ মেট্রিক টন চাল ও ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।

বান্দরবান: পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ

আবহাওয়ার অবনতির কারণে বান্দরবান জেলা প্রশাসন সব পর্যটনকেন্দ্রের কার্যক্রম বাড়তি সতর্কতার স্বার্থে ১৫ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত করেছে। জেলাপরিষদের জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, চলমান পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

মৌলভীবাজার: বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ প্লাবন

ভারি বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে মৌলভীবাজারে পরিস্থিতি তীব্রভাবে খারাপ হয়েছে। রাজনগর ও কমলগঞ্জ উপজেলায় মনু ও ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে উপচে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। রাজনগর ও কমলগঞ্জে অন্তত ৫০টির বেশি গ্রাম পানির নিচে তলিয়ে গেছে; বহু মানুষ পানিবন্দি ও মানবেতর জীবনযাপন করছে। অনেক ক্ষেতের আউশ ধান পানির নিচে ডুবে গেছে এবং কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

রাজনগরে বাঁধের ফাটল মেরামতের জন্য বালুবস্তা ভরা হচ্ছে এবং মানুষদের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে স্থানান্তরের কাজ চলছে। কমলগঞ্জে ধলাই নদীর পানি বিপৎসীমার ৩৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার ফলে প্রায় ২৫টি গ্রামের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ৩-৪ ফুট পানির নিচে রয়েছে; যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। স্থানীয়রা পানি উন্নয়ন বোর্ডের গাফিলতির অভিযোগও তুলছেন। জেলা প্রশাসন ১৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছে এবং জরুরি খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করছে।

সিলেট ও উত্তর-পূর্ব অঞ্চল: আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা

সিলেটে কুশিয়ারা, সুরমা ও অন্যান্য নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। পাউবোর তথ্যমতে কুশিয়ারা নদীর অমলশিদ পয়েন্টে পানি সমতল ১৪.৫৬ মিটার, যা বিপৎসীমার খুব কাছাকাছি। সিলেট পয়েন্টে এখন পর্যন্ত কোনো নদী বিপৎসীমা অতিক্রম না করলেও সীমান্তবর্তী এলাকার ওপর উজান থেকে ঢলের প্রভাব বাড়লে আকস্মিক (ফ্ল্যাশ) বন্যার সম্ভাবনা জোরালো। পাউবো সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী ক’ছেন, আগামী কয়েক দিনে মেঘালয়ে ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে; এতে সিলেট অঞ্চলে নদীগুলোর পানি আরও বাড়তে পারে।

নদীভিত্তিক সার্বিক চিত্র

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলছে বর্তমানে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, বান্দরবান, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলায় বন্যা পরিস্থিতি বিরাজ করছে। অন্যদিকে ফেনী, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নীলফামারী ও লালমনিরহাট জেলায় বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।

ব্রহ্মপুত্রের পানি আপাতত স্থিতিশীল থাকলেও যমুনার পানি বাড়ছে; উভয় নদী এখনও বিপৎসীমার নিচে প্রবাহিত হচ্ছে। সুরমা-কুশিয়ারার কিছু পয়েন্টে পানি কিছুটা নামলেও কুশিয়ারার নির্দিষ্ট স্থান সতর্কসীমার আশেপাশে রয়েছে এবং আগামী দুই-তিন দিনে আবার বাড়ার সম্ভাবনা আছে। তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি আগামী দুই দিনে বাড়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টায় পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের গোমতী, মুহুরি, ফেনী, সেলোনিয়া, হালদা, সাঙ্গু ও মাতামুহুরীর পানি দ্রুত বাড়তে পারে; কক্সবাজার, ফেনী, চট্টগ্রাম, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির কিছু এলাকায় এসব নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে সাময়িক বন্যা সৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীর কিছু নিম্নাঞ্চলও প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া ও প্রস্তুতি

জেলা প্রশাসন, ত্রাণ সংস্থা ও পানি উন্নয়ন বোর্ড মাঠ পর্যায়ে নজরদারি ও ত্রাণ বিতরণে ব্যস্ত। আক্রান্ত এলাকা থেকে মানুষকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া, আশ্রয়কেন্দ্রে বসতি গড়া ও শুকনো খাবার ও জরুরি সামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও তৎকালীন ত্রাণকর্মীরা মাঠে নেমে লোকজনকে সহায়তা করছেন।

সতর্কতা

বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র ও পানি উন্নয়ন বোর্ড পুনরায় বলেছে যে নদী সংলগ্ন ও নিম্নাঞ্চলের মানুষ যেন স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলেন, প্রবল ঝড় এবং ঢলের সময় নদীর কাছাকাছি না যান এবং যাতে পারে দ্রুত নিরাপদ স্থানে চলে যান। আগামী কয়েক দিনে আবহাওয়ার পরিবর্তন ও উজান ঢলের প্রভাবে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে পারে, তাই সকলকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।