বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারে বাণিজ্যিক দুই প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত উদ্যোগে বালিয়াড়ি কেটে একটি কৃত্রিম খাল নির্মাণ করা হয়েছে। প্রাকৃতিকভাবে পানি চলাচলের স্বাভাবিক পথ অবরুদ্ধ করে একটি বাঁধ তৈরি হওয়ায় বাধ্য হয়ে এই খালটি খনন করা হয়।
এই কৃত্রিম খাল নির্মাণের ফলে সমুদ্র সৈকত অবিচ্ছিন্নভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে এবং বালিয়াড়িতে তীব্র ভাঙনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। সৈকতজুড়ে গর্ত ও গুপ্তখাল সৃষ্টি হওয়ায় পর্যটকদের নিরাপদ সমুদ্রস্নানের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এছাড়া, এই খালের মাধ্যমে হোটেল-মোটেল অঞ্চলের ময়লা পানি সরাসরি সাগরে গড়িয়ে পরিবেশ দূষণে শামিল হচ্ছে, যা পরিবেশবাদীদের জন্য উদ্বেগের বিষয়।
গত মঙ্গলবার কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের কলাতলী পয়েন্ট সংলগ্ন ডিভাইন ইকো রিসোর্টের পাশেই এই কৃত্রিম খালটির সৃষ্টির প্রমাণ পাওয়া গেছে। আশপাশের পর্যটন ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, আগে হোটেল-মোটেল এলাকার পানি একটি প্রাকৃতিক ছড়ার মাধ্যমে সাগরে চলে যেত। কিন্তু বর্ষাকালে প্যাসিফিক বিচ লাউঞ্জ ক্যাফের মালিক ওই ছড়াটি বন্ধ করে বালির ব্যাগ দিয়ে বাঁধ তৈরি করেন, যার ফলে ডিভাইন ইকো রিসোর্টের সামনের এলাকায় পানি জমে বড় ও গভীর ডোবা তৈরি হয়। পরে জমে থাকা পানির নিষ্কাশনের জন্য রিসোর্টটির দক্ষিণ-পশ্চিম সীমানার পাশে বালিয়াড়ি কেটে একটি কৃত্রিম খাল খনন করা হয়।
এই খালের মাধ্যমে জমে থাকা পানিসহ ভারী বর্ষায় ঢল আমদানি সাগরে ছড়িয়ে পড়ছে। তদুপরি জোয়ার-ভাটার সময় পানির চলাচলের কারণে খালের পরিধি দিন দিন বাড়ছে, যা অবিচ্ছিন্ন সমুদ্র সৈকতকে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। প্যাসিফিক বিচ লাউঞ্জ ক্যাফে ও ডিভাইন ইকো রিসোর্টের নিয়োগকৃত শ্রমিকরাই এ কাজটি করেছেন বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।
কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি দীপক শর্মা দীপু এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, দুটি প্রতিষ্ঠান ব্যক্তিগত স্বার্থে এমন অপপ্রয়াস চালিয়েছে, যা পরিবেশ এবং পর্যটন নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। তারা জানিয়েছে, ময়লাযুক্ত পানি সাগরে মিশে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপদ স্নানের সুযোগও কমছে এবং প্রাণহানির আশঙ্কাও প্রবল।
সী সেফ লাইফ গার্ড সংস্থার সিনিয়র কর্মী মোহাম্মদ শুক্কুর বলেন, সাম্প্রতিক বর্ষায় সৈকতে তৈরি হওয়া গর্ত ও গুপ্তখালের ফলে ইতোমধ্যে ৮ জন পর্যটক মৃত্যুবরণ করেছেন। স্বাভাবিক গর্ত ও গুপ্তখাল চিহ্নিত করাও অত্যন্ত কঠিন।
ডিভাইন ইকো রিসোর্টের প্রতিনিধিত্বকারী মোহাম্মদ সেলিম জানান, তারা খালের খননের সঙ্গে জড়িত নন এবং কারা এই কাজ করেছে তা জানেন না। তবে পূর্বের প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ অবরুদ্ধ হওয়ার ফলে বিকল্প পথে পানি প্রবাহিত হচ্ছে এবং তাদের প্রতিষ্ঠানের সীমানা ক্ষতির মুখে পড়েছে।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সালাহ্উদ্দিন এই বিষয়টি নিয়ে বলেছেন, সাধারণত এর তদারকি কক্সবাজার পৌরসভা ও সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে পড়ে, তবে কেউ অবৈধ কোনো কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হলে জেলা প্রশাসন কঠোর ব্যবস্থা নেবে।
এই ঘটনায় কক্সবাজারের পরিবেশ, পর্যটন ও সামগ্রিক স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজন সচেতনতা ও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।







