ঢাকা | বুধবার | ৬ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৩শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৯শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

কুকি-চিন সন্ত্রাস বনাম বান্দরবানের পর্যটন: ক্ষতির স্রোতবাহ

প্রকৃতির অপরূপ সাজ-পোশাকে সজ্জিত বান্দরবান জেলা মেঘ, পাহাড়, নদী ও ঝর্ণার অপরিসীম সৌন্দর্যের কারণে দেশের নানা প্রান্ত থেকে পর্যটকদের আকর্ষণ করে। কিন্তু সম্প্রতি এখানে কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) নামে সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর উত্থানের ফলে নিরাপত্তার সুস্থিতি বিঘ্নিত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে পর্যটন শিল্পে, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ করার কারণে ব্যবসায়ীরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

বান্দরবান পার্বত্য তিন জেলার মধ্যে একটি, যেখানে দক্ষিণে কক্সবাজার, উত্তরে রাঙামাটি, পূর্বে মিয়ানমার এবং উত্তর পশ্চিমে চট্টগ্রাম জেলা অবস্থিত। ২০২০ ও ২০২১ সালের কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাব কাটিয়ে ওঠার আগেই ২০২২ সালের ১৮ অক্টোবর রুমা ও রোয়াংছড়ি উপজেলায় অনির্দিষ্টকালের জন্য পর্যটন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এরপর থানচি, আলীকদমসহ বিভিন্ন উপজেলায় পর্যায়ক্রমে নিষেধাজ্ঞা এবং প্রত্যাহার চলতে থাকে, যা পাহাড়ের পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাড়ানাও হয়।

২০২৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি কিছু উপজেলায় নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়, কিন্তু ১৬ মার্চ থেকে পুনরায় জারি করা হয়, এবং ২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর আবারও পর্যটন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। বর্তমানেও রুমা, রোয়াংছড়ি ও থানচি উপজেলায় নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে, যদিও অন্যান্য চার উপজেলায় এটি প্রত্যাহার করা হয়েছে।

কেএনএফের উত্থান শুরু হয় ২০১২ সালে কুকি-চিন ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন নামে সংগঠন করার মাধ্যমে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের সাবেক ছাত্র নাথান বম এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা। প্রথমে তারা পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন নৃগোষ্ঠী ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন করলেও পরবর্তীতে আন্ডারগ্রাউন্ড হয়ে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে। কেএনএফ বান্দরবানের কয়েকটি উপজেলা এবং রাঙামাটির বিভিন্ন এলাকাকে নিজেদের ‘রাজ্য’ দাবি করে এবং তাদের সামরিক সদস্যরা মিয়ানমারের কাচিন থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছে।

ফেসবুকে তাদের পেজের মাধ্যমে তারা বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে এবং পাল্টা হামলার মাধ্যমে নিরাপত্তা অবস্হাকে বিপন্ন করছে। কেএনএফের বিরুদ্ধে সশস্ত্র হামলা, চাঁদাবাজি, অপহরণ, গুম, ও ডাকাতির মতো ঘটনার অভিযোগ উঠে। ২০২৪ সালে বান্দরবানের দুই উপজেলায় ব্যাংক ডাকাতিতে তাদের জড়িত থাকার খবর আইনের চোখে এসেছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত অভিযান চালিয়ে তাদের অনেক সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে এবং বিভিন্ন অস্ত্র উদ্ধার করেছে, যদিও অভিযানে কিছু সদস্য সীমান্ত পাড়ি দিয়ে মিজোরাম চলে যাওয়ায় সাধারণ জনগণের পাশাপাশি অন্যান্য গোষ্ঠীগুলোর মধ্যেও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।

বান্দরবান হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির মতে, দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা সমস্যার কারণে পর্যটন ব্যবসায় ব্যাপক সংকট সৃষ্টি হয়েছে, যা শুধুমাত্র কয়েক বছরের মধ্যে পূরণ সম্ভব নয়। তবে বর্তমানে কিছু পর্যটনকেন্দ্র পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার চেষ্টা চলছে।

সম্প্রতি কেএনএফের জন্য ইউনিফর্ম তৈরির জন্য কাপড় সরবরাহের অভিযোগে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং হাজার হাজার ইউনিফর্ম জব্দ করা হয়েছে। গত একমাসে তাদের প্রায় দুই হাজার সদস্যকে আটক করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসক শামীম আরা রিনি নিশ্চিত করেছেন যে, দর্শনীয় স্থানগুলোতে এখন কোনো পর্যটন নিষেধাজ্ঞা নেই এবং পর্যটকদের যে কোনো নিরাপত্তাজনিত শঙ্কা নেই। এছাড়া, সেনাবাহিনীর যৌথ অভিযান এখনও অব্যাহত রয়েছে যাতে পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায়।

এই পরিস্থিতিতে বান্দরবানে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যাতে বিশ্ব সুন্দর এই জেলা তার পর্যটন সম্ভাবনা থেকে পিছিয়ে না পড়ে।