ঢাকা | রবিবার | ৩রা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২০শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৬ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

কুড়িগ্রাম–চিলমারী রেলপথ আধুনিকায়নে অগ্রগতি নেই, যাত্রীদের ভোগান্তি অব্যাহত

মাত্র ২৯ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের কুড়িগ্রাম থেকে চিলমারী পর্যন্ত রেলপথটি আধুনিকায়নের জন্য নিয়োজিত প্রকল্পে দীর্ঘদিন থেকেই কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। এই রুটে চলাচলকারী একমাত্র লোকাল ট্রেনটি প্রতিদিন একবার চলাচল করে, তবে নির্ধারিত সময়ের তুলনায় প্রায় সবসময়ই দেরিতে পৌঁছে। ভাঙাচোরা রেললাইন থাকার কারণে ট্রেনের গতি ঘণ্টায় মাত্র ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার, যা ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকের গতি ৪০ থেকে ৪৫ কিলোমিটারের তুলনায় অনেক কম।

কুড়িগ্রাম–রমনা রেলপথে পাঁচটি স্টেশন থাকলেও রেলসেবার মান অত্যন্ত দুর্বল। বিশেষ করে রমনা স্টেশনে প্রতিদিন শত শত যাত্রী ট্রেনের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে বাধ্য হন। ৬৫ বছর বয়সী ট্রেনযাত্রী মফির উদ্দিন জানান, ‘‘একসময়ে রমনা স্টেশন ছিল খুবই ব্যস্ত। প্রতিদিন তিন জোড়া ট্রেন চলত, কিন্তু এখন কখনো ট্রেন চলে, কখনো চলে না। তবু ট্রেনে চলাই সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও নিরাপদ যাতায়াত, তাই আমরা অপেক্ষা করি।’’

স্থানীয় স্কুলশিক্ষক আব্দুস সালাম বলেন, ‘‘চিলমারীতে নদী ভাঙ্গন এবং দারিদ্র্যের কারণে অনেক মানুষ কুড়িগ্রাম বা আশেপাশের শহরে গিয়ে দিনমজুরির কাজ করেন। তাদের জন্য ট্রেনই একমাত্র ভরসা যাতায়াতের স্বল্প খরচের মাধ্যম হিসেবে। কিন্তু দুর্বল রেললাইন ও আধুনিকায়নের অভাবে যাতায়াত এখন অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে উঠেছে।’’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘‘রেলপথ পুনর্বাসনের প্রকল্প মোটেও গতি পাচ্ছে না। দুদফা মেয়াদ বাড়ানো সত্ত্বেও কাজ বন্ধ রয়েছে। চিলমারী অঞ্চলের প্রতি দৃষ্টিপাত করতে বলছি আমরা, আর বেশি বৈষম্য চাই না।’’

চিলমারী নৌবন্দরকেন্দ্রিক যাত্রী চাপের কথাও তিনি উল্লেখ করেন, ‘‘প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এই বন্দরের যাতায়াত করে। রেলপরিবহন ব্যবস্থা উন্নত হলে তাদের চলাচলে বড় সুবিধা হবে।’’

রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে কুড়িগ্রাম–চিলমারীর রেলপথ পুনর্বাসন ও আধুনিকায়নের দুটি পৃথক প্রকল্প শুরু হয়। কুড়িগ্রাম থেকে উলিপুর পর্যন্ত ১৯ কিলোমিটার রেলপথের কাজের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয় ২৯ কোটি টাকা, আর রমনা থেকে উলিপুর পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার রেলপথের জন্য নিকট ৩৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয় অনুমোদিত হয়।

এই প্রকল্পের আওতায় ছিল মাটি ভরাট, প্রটেকশন ওয়াল নির্মাণ, নতুন রেললাইন ও স্লিপার বসানো, পাশাপাশি ১২টি সেতু ও কালভার্ট সংস্কার। কাজ শুরু হওয়ার সময় ছিল ২০২৩ সালের নভেম্বর, যা শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৫ সালের জানুয়ারি। পরবর্তীতে মেয়াদ বাড়িয়ে তা ২০২৫ সালের জুন এবং সর্বশেষ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর করা হয়।

বিশ্বাস কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের ম্যানেজার রুবেল ইসলাম জানান, ‘‘আমরা অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে রয়েছি। রেলওয়ের কাছ থেকে আমাদের কাজের অর্ধেক বিল এখনও পাওনা রয়েছে, যার কারণে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কিনতে পারছি না এবং কাজ থমকে আছে।’’

তিনি আরও জানান, ‘‘কুড়িগ্রাম থেকে উলিপুর পর্যন্ত অংশের প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হলেও রমনা থেকে উলিপুর পর্যন্ত অংশে মাত্র ২৫ শতাংশ কাজ হয়েছে। পুরো বিল পেলে দ্রুত কাজ শেষ করা সম্ভব হতো।’’

লালমনিরহাট রেলওয়ে বিভাগের বিভাগীয় প্রকৌশলী শিপন ইসলাম বলেন, ‘‘ঠিকাদারের আর্থিক সমস্যার কারণে প্রকল্পের গতি লক্ষণীয় নয়। আমরা তাদের বার বার তাগাদা দিচ্ছি এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিল অনুমোদনের জন্য জানিয়েছি।’’

তিনি আশা প্রকাশ করেন, ‘‘রেলপথ পুনর্বাসন শেষ হলে চিলমারী থেকে কুড়িগ্রাম পর্যন্ত রুটে দ্রুতগতিতে ট্রেন চলাচল সম্ভব হবে এবং নতুন ট্রেন যুক্ত করা যাবে। এছাড়া চলতি বছরের মধ্যেই প্রকল্প সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।’’

তবে এখানকার যাত্রী ও স্থানীয় মানুষদের জন্য এখনও অপেক্ষা করে যেতে হবে উন্নত পরিবহণ ব্যবস্থার জন্য।