ঢাকা | বৃহস্পতিবার | ৩০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৩ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

জাতীয় পার্টিতে গভীর অস্থিরতা: শীর্ষ নেতাদের পদ থেকে অব্যাহতি ও নতুন মহাসচিব নিয়োগ

জাতীয় পার্টির দশম জাতীয় সম্মেলনকে কেন্দ্র করে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে তীব্র সংঘাত ও অস্থিরতা বিরাজ করছে। এসব অস্থিরতার প্রেক্ষিতে দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদের তিন প্রখ্যাত নেতা — আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার ও মহাসচিব মো. মুজিবুল হক (চুন্নু) — কে দলের সকল পদ থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন। এছাড়া প্রেসিডিয়াম সদস্য শামীম হায়দার পাটোয়ারীকে নতুন মহাসচিব হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে।

গতকাল বিকেলে এই নিয়োগের তথ্য দলীয় কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে প্রকাশ করা হয়। এরও আগে মহাসচিব মো. মুজিবুল হককে পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। অব্যাহত উত্তেজনার এক পর্যায়ে তিন নেতাকে দলের সব পদ থেকে অব্যাহতি প্রদান করেন চেয়ারম্যান জি এম কাদের।

জাতীয় পার্টির দশম জাতীয় সম্মেলন গত ২৮ জুন ঢাকার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও ১৬ জুন এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সম্মেলন স্থগিতের ঘোষণা আসে। দলীয় নেতাদের মতে, সম্মেলন স্থগিত করার সিদ্ধান্ত চেয়ারম্যান জি এম কাদের এককভাবে এবং প্রেসিডিয়াম সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই নিয়েছেন। এই সিদ্ধান্তে দলের সিনিয়র নেতারা গুরুতর আপত্তি জানান।

দলের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া বিভেদের পেছনে রয়েছে সম্মেলন আয়োজনে বিলম্ব, চেয়ারম্যানের একক ক্ষমতার ব্যবহার, আর্থিক স্বচ্ছতার অভাবসহ নানা ইস্যু। সম্মেলনের স্থগিতাদেশ পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে।

জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় দপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, গত ২৫ জুন জেলা ও মহানগর কমিটির শীর্ষ নেতারা সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, কো-চেয়ারম্যান রুহুল আমিন হাওলাদার ও মহাসচিব মো. মুজিবুল হকের বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ করেন এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান। ২৮ জুন প্রেসিডিয়ামে অনুষ্ঠিত সভায় এই অভিযোগের ভিত্তিতে তিন নেতাকে পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। গঠনতন্ত্র অনুসারে চেয়ারম্যান এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করেছেন।

অব্যাহতির ঘোষণার ঠিক আগে, দুই সিনিয়র নেতা আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও রুহুল আমিন হাওলাদার মহাসচিব হিসেবে মো. মুজিবুল হক ছাড়াই শামীম হায়দার পাটোয়ারীর নিয়োগের কঠোর প্রতিবাদ জানিয়ে একটি বিবৃতি প্রদান করেন। তারা এই নিয়োগকে গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক মূল্যবোধের পরিপন্থী, ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও স্বৈরাচারী সিদ্ধান্ত হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তাঁদের মতে, এই পদক্ষেপ জাতীয় পার্টির শাশ্বত আদর্শ ও গঠনতন্ত্রের গুরুতর লঙ্ঘন এবং পার্টির স্থিতিশীলতাকে বিপন্ন করছে।

দলের কেন্দ্রীয় দপ্তর আরও জানায়, চেয়ারম্যান গঠনতন্ত্রের ক্ষমতায় মহাসচিব মো. মুজিবুল হককে অব্যাহতি দিয়ে শূন্য পদে শামীম হায়দার পাটোয়ারীকে নিয়োগ দিয়েছেন। তথাপি সিনিয়র দুই নেতা জোর দিয়ে বলেন, ঘোষণা আগে কোনো নিয়োগ বা বহিষ্কার কার্যকর হবে না কারণ জাতীয় কাউন্সিল এখনও অনুষ্টিত হয়নি। এই ঘটনার জন্য তাঁরা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও দলীয় শৃঙ্খলা হত্যা মনে করেন।

বিবৃতিতে এই দুই নেতার দাবি, জাতীয় পার্টির আদর্শ ও গঠনতন্ত্রকে সম্মান করে দলকে গণতান্ত্রিক, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও সম্মিলিত নেতৃত্বের ভিত গড়ে তোলা এখন সময়ের অতিদ্রুত প্রয়োজন। যুগ্ম বিবৃতিতে তাঁরা দলের সকল নেতাকর্মীকে অনুরোধ করেন, স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দলে ন্যায্যতা ফিরিয়ে আনতে।

সাম্প্রতিক এই অস্থিরতা জাতীয় পার্টির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন একটি অধ্যায় যোগ করেছে এবং দলকে ভবিষ্যতে আরও একতা ও স্বচ্ছন্দতার দিকে এগিয়ে নেয়ার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।