টানা ভারি বর্ষণে রাঙামাটি, বান্দরবান ও চট্টগ্রামসহ পার্বত্যাঞ্চলে দুর্যোগ পরিস্থিতি আরও গভীর হয়েছে। পাহাড় ধস, সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা ও নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় হাজারের বেশি মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। ঘটনাস্থলগুলোতে জরুরি ত্রাণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন জেলা প্রশাসন, স্থানীয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো।
রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের বরাত বলা হয়েছে যে, বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) বিকেল ৪টা পর্যন্ত জেলার ৩৪টি আশ্রয়কেন্দ্র খুলে মোট ৪,২৬৫ জন আশ্রয় নিয়েছেন। আশ্রয়প্রার্থীদের প্রতিদিন তিন বেলা খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের তথ্যে এখন পর্যন্ত জেলার ১০০ স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে—কাপ্তাইয়ে ১৫টি, বাঘাইছড়িতে ৩টি, কাউখালীতে ৩০টি, রাঙামাটি সদরে ১৩টি, বিলাইছড়িে ৩৭টি এবং নানিয়ারচরে ২টি। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারদের মধ্যে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটও বিতরণ করা হচ্ছে।
বান্দরবানের লামায় পাহাড়ধসে দুই পরিবারের ঘরে চাপা পড়ে ঘুমন্ত অবস্থায় এক শিশুসহ পাঁচজন নিহতের মর্মান্তিক খবর পাওয়া গেছে। ঘটনাটি ঘটেছে বৃহস্পতিবার ভোরে আজিজনগর ইউনিয়নের মিশনপাড়া এলাকায়। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন মো. ইউনুছ (২৮), তার স্ত্রী রানু আক্তার (২২) ও তাদের চার বছর বয়সী ছেলে মো. সোলেমান; এবং মো. জুয়েল (২৭) ও তার স্ত্রী কুলসুমা আক্তার (২৩)। পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় সিভিল ডিফেন্স সদস্যরা খবর পেয়ে উদ্ধার অভিযান চালায় এবং নিহতদের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে, বলে লামা থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. কাইছার হামিদ জানান।
লামা উপজেলায় ওই পাহাড়ধস ও পাহাড়ি ঢলের পানির ঢলে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে প্রায় এক হাজার বাড়িঘর প্লাবিত হয়েছে ও দুই শতাধিক বাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। লামা-আলীকদম সড়কের কেয়ারারঝিরি, রেপারপাড়া ও লাইনঝিরি এলাকায় পানিতে ডুবে গাড়ি চলাচল বন্ধ রয়েছে। ফলে অভ্যন্তরীণ যোগাযোগও বিঘ্নিত হয়েছে। অঞ্চলটির বিভিন্ন ইউনিয়নের বীজতলা ও ফসলও পানির নিচে তলিয়ে গেছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কথায়, মাতামুহুরী নদী ও বিভিন্ন খালে অস্বাভাবিকভাবে পানি বৃদ্ধির ফলে হাজারের অধিক মানুষ গৃহবন্দি হয়ে পড়েছেন এবং বহু শ্রমজীবী কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।
ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রশাসন মাইকিং করে ঝুঁকিপূর্ণদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি প্রশাসন ৫৫টি বিদ্যালয় অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে খুলে দেয়, যেখানে কয়েকশ পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। রাঙামাটি সদর উপজেলার মগবান ইউনিয়নের দলমনি চাকমা (পিতা: অলা চাকমা) গত ৭ জুলাই নদী পারাপারের সময় স্রোতে ভেসে নিখোঁজ হন; পরে বৃহস্পতিবার তার মরদেহ উদ্ধারের খবর জানা গেছে।
বিলাইছড়ি উপজেলা প্রশাসনের তথ্যে, উপজেলার ১৪টি আশ্রয়কেন্দ্রের মধ্যে বর্তমানে ৪টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১২২ জন আশ্রয় নিয়েছেন। এছাড়া এক বহিরাগত ব্যবসায়ী বুধবার থেকে নিখোঁজ রয়েছেন। নতুন করে অন্যান্য কোন হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
রাস্তাঘাটেও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে—বাঘাইছড়ি-মারিশ্যা-দিঘীনালা সড়কের তিন কিলোমিটার অংশ ধসে যাওয়ায় ওই সেকশনে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। লামা-আলীকদম সড়কও একাধিক স্থানে প্লাবিত ও ধসে যাওয়ায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। মোবাইল নেটওয়ার্কও অনেক জায়গায় অসম্প্রচারিত হওয়ায় তত্ক্ষণাৎ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার সঠিক হিসাব নেওয়া জটিল হয়েছে।
বান্দরবান লামার সঙ্গে ঘটনাস্থল থেকে কথা বললে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মঈন উদ্দিন বলেন, বর্ষণের শুরু থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং ও বাড়ি বাড়ি সতর্কতা দেয়া হয়েছে, তবু কিছু মানুষ সময়মতো সরে যেতে পারেননি। পৌরসভার পক্ষ থেকে আশ্রয়কেন্দ্রে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফীসহ প্রশাসনিক দল আশ্রয়কেন্দ্রগুলো নিয়মিত পরিদর্শন করছেন।
কক্সবাজারের চকরিয়ার বরইতলীতে বৃহস্পতিবার ভোররাতে পাহাড়ধসে দুই শিশু নিহত হয়েছে। নিহতদের নাম রুমি আক্তার (১৫) ও মো. তৌসিফ (১০)। রুমি বরইতলী দাখিল মাদ্রাসার দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী; তৌসিফ ওই এলাকার চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী। বরইতলী ইউপি চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ছালেকুজ্জামান ঘটনাকে মর্মান্তিক হিসেবে বর্ণনা করেন।
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় জমে থাকা বৃষ্টির পানিতে মো. ইশতিয়াক (৬) নামে একটি শিশু ডুবে মারা গেছে। শিশুকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। প্রয়োজনে ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে চিকিৎসা ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি সংস্থাগুলো ত্রাণ বিতরণ, উদ্ধারকাজ ও আশ্রয় ব্যবস্থায় সর্বাত্মক কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী ভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় পাহাড়ধস ও বন্যার কারণে আরও ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন জনসাধারণকে বাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে এবং সকল প্রাসঙ্গিক সংস্থার তরফে তৎপরতা বাড়ানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে।








