সাম্প্রতিক ঘটনাবলীতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে তেহরানসহ ইরানের নানা অঞ্চলে হামলার খবর আসে; এরপরই ইরান পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র অভিযান চালায় বলে বিভিন্ন সংবাদ সংস্থা জানায়। পরিস্থিতি দ্রুত তীব্র আকার নেয় এবং মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বেড়ে গেছে।
সিএনএন লাইভ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন বাহিনী কয়েকদিন ধরেই ইরানের লক্ষ্যভিত্তিক অভিযান পরিকল্পনা করছিল। একই সময়ে ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে তেহরানের পাস্তৌর এলাকা ও আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির বাসভবন এবং কার্যালয়ের কাছে একাধিক বিস্ফোরণ হয়েছে। ফারস নিউজ এজেন্সি বলেছে, ওই এলাকায় অন্তত সাতটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে; তবে এসব হামলায় খামেনি লক্ষ্য ছিলেন কি না, তা এখন নিশ্চিত নয়।
ইরানি সরকারি দিক থেকে শুরুতে সীমিত বিবৃতি এসেছে। দেশটির প্রেসিডেন্টকে নিরাপদে আছেন বলে সরকারিভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে। এর আগে রয়টার্সকে এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে আয়াতুল্লাহ খামেনি তৎকালীন সময়ে তেহরানে ছিলেন না এবং তাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এক ভয়াবহ মানবিক ক্ষতি সম্পর্কে ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা জানায়, দক্ষিণ ইরানের হরমুজগান প্রদেশের মিনাব শহরে শাজারেয়ে তাইয়্যেবাহ নামক একটি বালিকা বিদ্যালয়ের ওপর বিমান হামলায় অন্তত ৫৩ জন শিক্ষার্থী নিহত এবং কমপক্ষে ৬৩ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। মিনাব প্রদেশের গভর্নর মোহাম্মদ রাদমেহর জানিয়েছেন, স্কুল ভবন সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতে ধ্বংস হয়েছে এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে হয়ত আরও লোক চাপা পড়েছে। স্থানীয় উদ্ধারকারীরা এখনও ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন এবং পুরো অঞ্চলের হাসপাতালে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। এই তথ্যগুলো রাষ্ট্রীয় সূত্র থেকে পাওয়া বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইরান পাল্টা আক্রমণে মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে বলে ফারস নিউজ জানিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাতারের আল-উদেইদ বিমান ঘাঁটি, কুয়েতের আল-সালেম ঘাঁটি, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল-ধাফরা ঘাঁটি এবং বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদরদপ্তরসহ বেশ কিছু লক্ষ্যভিত্তিক আঘাত হয়েছে। আল জাজিরা জানিয়েছে, আবু ধাবিতে একটি হামলায় এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি রিয়াদে একটি বড় বিস্ফোরণের খবর নিশ্চিত করেছে।
বাহরাইনের রাজধানী মানামায় বিস্ফোরণ এবং সাইরেনের শব্দের খবরও পাওয়া গেছে। সেখানে আতঙ্কের মধ্যে জরুরি সতর্কতামূলক সাইরেন বাজানো হয় এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষ সামাজিক মাধ্যমে জনগণকে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার জন্য বারবার অনুরোধ করেছে। তবে বিস্ফোরণের উৎস সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত বিবৃতি পাওয়া যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের সময় ইরানে ইন্টারনেট প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গিয়েছে বলে আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণ সংস্থা নেটব্লকস জানিয়েছে। তাদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইরানের ইন্টারনেট ট্রাফিক মাত্রা প্রায় ৪ শতাংশে নেমে এসেছে। এ ধরনের ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতার কড়া ব্যবস্থা গত বছরও দেখা গিয়েছিল।
ইরান থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইসরায়েলের বিভিন্ন অঞ্চলে সাইরেন শুনতে পাওয়া গেছে এবং উত্তর ইসরায়েলে বিস্ফোরণের শব্দও রেকর্ড হয়েছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে; আপাতত কোনো বড় ক্ষয়ক্ষতি বা প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি বলে দেশীয় সংবাদমাধ্যম ও জরুরি পরিষেবা সূত্রে জানানো হয়েছে। টাইমস অভ ইজরায়েলও একইভাবে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি জানিয়েছে।
সংঘাতের কারণে বেসরকারি ও আঞ্চলিক এয়ারলাইনগুলোও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে — কাতার এয়ারওয়েজ সব ফ্লাইট স্থগিত করেছে এবং টার্কিশ এয়ারলাইনস মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কিছু রুটে বিমান চলাচল বাতিল করেছে। বিভিন্ন দেশের আকাশসীমা নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে ভ্রমণ সেবা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এ মুহূর্তে মিনাবের ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও জীবিত-বিহীন উদ্ধারকার্যের সম্ভাব্যতা বিবেচনায় উদ্ধার তৎপরতা অব্যাহত আছে এবং হাসপাতালগুলোতে জরুরি শয্যা ও চিকিৎসা পরিসেবা বাড়ানো হচ্ছে বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও সরকারি সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যগুলো স্বতন্ত্রভাবে যাচাই চলছে; পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে, তাই নিশ্চিত বিবরণের জন্য সরকারি ও বিশ্বস্ত সংবাদসংস্থার আপডেট পর্যবেক্ষণ করাই যুক্তিযুক্ত।








