ঢাকা | শুক্রবার | ১০ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৬শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২৫শে মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

দিনাজপুর থেকে ইউরোপের তিন দেশে টিনজাত ভুট্টা রপ্তানি শুরু

দিনাজপুরের পার্বতীপুর থেকেই ইউরোপের বাজারে টিনজাত ভুট্টা পাঠানো শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ ও স্পেনের যৌথ পুঁজিতে গড়ে ওঠা ‘স্পেন বাংলাদেশ অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ’ গত ৬ জুন থেকে দেশের থেকে প্রস্তুত টিনজাত ভুট্টা রপ্তানি শুরু করেছে। উদ্বোধনী চালানে স্পেন, ইতালি ও পর্তুগালসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মোট প্রায় ২০০ কনটেইনার প্রক্রিয়াজাত ভুট্টা পাঠানো হচ্ছে। এই চালানের আর্থিক মূল্য প্রায় ৬০ লাখ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৭৩ কোটি ২০ লাখ টাকার সমপরিমাণ।

দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী শেলটেক গ্রুপ ও স্পেনভিত্তিক সেলেরিও গ্রুপ যৌথভাবে পার্বতীপুরে এই কারখানাটি নির্মাণ করেছে। কারখানাটি প্রায় দেড় বছর আগে নির্মাণ কাজ শুরু করে এবং গত বছরের জুনে স্পেন থেকে আনা বিশেষ জাতের ভুট্টার বীজ দিয়ে চুক্তিভিত্তিক চাষিরা প্রথম চাষাবাদ শুরু করেন। এখন পর্যন্ত এই প্রকল্পে মোট ৪ হাজার চুক্তিবদ্ধ কৃষক ভুট্টা চাষে যুক্ত আছেন এবং প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৪০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে।

শেলটেক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর আহমেদ বলেন, প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যে ভালো সম্ভাবনা দেখেই তারা এই খাতে বিনিয়োগ করেছেন। সেলেরিও গ্রুপ মূলত প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করবে এবং উৎপাদিত পণ্যের বিপণন আন্তর্জাতিক বাজারে নিশ্চিত করার দায়িত্ব নেবে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, আগামী পাঁচ বছরে পার্বতীপুর কারখানায় উৎপাদিত সমস্ত প্রক্রিয়াজাত খাদ্যসামগ্রী তাদের মাধ্যমে রপ্তানি করা হবে, তাই বাজারজাতকরণ নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগ নেই।

কারখানায় আসা কাঁচা ভুট্টা প্রথমে কঠোর মানদণ্ডে যাচাই-বাছাই করা হয়। এরপর সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় লাইন থেকে কনসার্ভ করে ক্যান বা কৌটাজাত পণ্য হিসেবে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা হয় এবং পরে কনটেইনারে ভরে রপ্তানির জন্য পাঠানো হয়। প্রতিষ্ঠানটি নিশ্চিত করেছে যে কৃষকদের কাছ থেকে ফসল কেনার শতভাগ নিশ্চয়তা দেওয়া হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় বীজ তারা বিনামূল্যে সরবরাহ করছে।

সংগঠনের পাশাপাশি জানানো হয়েছে, সাধারণ প্রথাগত ভুট্টার একেকটি ছড়ার ওজন সাধারণত ২০০–২৫০ গ্রাম হলেও স্পেন থেকে আনা হাইব্রিড বীজে ছড়ার ওজন ৪০০–৫০০ গ্রাম পর্যন্ত পাচ্ছে। বর্তমানে ৪ হাজার কৃষক যুক্ত থাকলেও ভবিষ্যতে এই নেটওয়ার্কে ৪০ হাজার কৃষক অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে।

ভুট্টার পাশাপাশি পার্বতীপুর কারখানায় আনারস প্রক্রিয়াজাতকরণও শুরু হয়েছে; টাঙ্গাইলের মধুপুর এলাকা থেকে আনারস সংগ্রহ করে তা টিনজাত করা হচ্ছে রপ্তানির উদ্দেশ্যে। ব্যাপক পরিকল্পনায় আনা হয়েছে ফ্রুট ককটেল, শুকনা আনারস, শুকনা আমসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত পণ্য এবং তাজা আম ও লিচুরও রপ্তানি করার প্রস্তুতি। তানভীর আহমেদ জানান, কারখানাটির বার্ষিক প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানি ক্ষমতা বর্তমানে ১৫–১৭ কোটি ডলারের পরিসরে, পূর্ণ সক্ষমতায় এটি ২০ কোটি ডলারে উন্নীত হতে পারে এবং ২০২৮ সালের মধ্যে সেই লক্ষ্য পূরণের আশা রয়েছে।

কৃষি ও খাদ্যখাতের পাশাপাশি শেলটেক গ্রুপ বড় পরিসরে আবাসন ও শিল্পে বিনিয়োগ করছে। রাজধানীর বনশ্রীতে ৫৩ কাঠা জায়গায় ‘শেলটেক লিগ্যাসি প্লাজা’ নামে ১৭ তলা একটি আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানটি; এতে মোট বিনিয়োগ ধরা হয়েছে ৫৭৫ কোটি টাকা এবং ভবনটিতে প্রায় ৩৫০টি দোকান, ফুড কোর্টসহ আধুনিক সুযোগ-সুবিধা রাখা হবে।

আরও জানিয়েছে, জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পে যৌথ উদ্যোগে ২১টি আবাসিক প্রকল্প তৈরি করা হবে যেখানে ২৬৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হচ্ছে। ব্লেন্ডেড সুতার উৎপাদন বাড়াতে এনভয় টেক্সটাইলস প্রায় ১৭৯ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়েছে এবং সিলেটে অ্যাব্রেসিভ পেপার উৎপাদনকারী গ্রাইন্ডটেক লিমিটেডে ৮৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। পরিবেশ সুরক্ষার অংশ হিসেবে বিভিন্ন কারখানায় কার্বন নিঃসরণ কমাতে ১০ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পও চলমান আছে।

শেলটেক ও এনভয় লিগ্যাসি গ্রুপের অধীনে বর্তমানে ৩১টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যাদের বার্ষিক টার্নওভার প্রায় ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা এবং কর্মীসংখ্যা প্রায় ১৭ হাজার। ২০৩০ সালের মধ্যে এটি ৫৮ হাজার কর্মী ও বার্ষিক লেনদেন ৯ হাজার ২০০ কোটি টাকায় উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

তানভীর আহমেদ বলেন, মোটামুটি দেড় হাজার কোটি টাকার এই বিনিয়োগের প্রক্রিয়া তারা ইতোমধ্যে শুরু করেছিলেন। প্রধান উদ্দেশ্য হলো রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনা এবং আমদানির বিকল্প দেশীয়ভাবে তৈরি করা—এখনকার পরিকল্পনা ও ভার্টিক্যাল ইন্টিগেশনের কারণে ঝুঁকির মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম থাকবে।