ঢাকা | রবিবার | ১৮ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | ২৯শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি

পদ্মার দুর্গম চরে সক্রিয় চরমপন্থী ও সন্ত্রাসী বাহিনী

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার পদ্মা নদীর দুর্গম চরাঞ্চল ও ভারতীয় সীমান্তের কাছাকাছি এলাকাগুলো দীর্ঘদিন ধরে অপরাধীদের আড়ত হিসেবে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি এই অঞ্চলটিতে জমি দখল, সংঘর্ষ এবং গোলাগুলির ঘটনায় তিনজন নিহতের ঘটনা ঘটেনোর পর প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নিতে চাইলেও কার্যত কিছুই করতে পারছে না। জানা যাচ্ছে যে, কাকন বা মণ্ডল বাহিনী ছাড়াও সাইদ, রাখি, কাইগি, রাজ্জাক ও বাহান্ন বাহিনী নামের আরও বেশ কিছু সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয় এই চরে। এ সব বাহিনী রাজনৈতিক আশ্রয়প্রাপ্ত হয়ে জমি দখল, ফসল কেটে নেওয়া, চাঁদাবাজি, বালু উত্তোলন, মাদক, অস্ত্র ও চোরাচালানের মতো নানাবিধ অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন যে, এই বাহিনীগুলো পদ্মার এই দুর্গম অরণ্যসদৃশ এলাকায় তাদের নিজস্ব রাজ্য গড়ে তুলেছে, যেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রবেশ একেবারেই সীমিত। রাজশাহী, নাটোর, পাবনা ও কুষ্টিয়া জেলা জুরে এই চরাঞ্চলগুলোতে তাদের প্রভাব বিস্তৃত।সম্প্রতি, দৌলতপুর উপজেলার পদ্মা চরাঞ্চলে কাকন বাহিনী ও মণ্ডল গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে উভয় পক্ষের তিনজন নিহত হন। এতে প্রশাসন গভীরভাবে সরব হয়ে উঠেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে, কালো রঙের মামলা করে কাকন বাহিনীর প্রধান কাকনের বিরুদ্ধে। গত বৃহস্পতিবার সকালে থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জেলা পুলিশের একাধিক টিম শতাধিক সদস্য নিয়ে এই চরাঞ্চলে ব্যাপক আর কোনো আঘাত ও অভিযান চালিয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে জোড়া অভিযোগে অভিযুক্তের খোঁজ চালিয়েছে। তবে প্রথম দিনেই কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ, বলেছে যে অভিযান অব্যাহত থাকবে। স্থানীয় সূত্র জানাচ্ছে যে, বহু বছর ধরে এই চরাঞ্চলের দৌলতপুরের পদ্মা নদীর এই দুর্গম এলাকায় ডজনখানেক সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয়। ইতিহাস বলছে, প্রায় ২০ বছর আগে এই এলাকায় মূলত পান্না বাহিনী ও লালচাঁদ বাহিনী নামে দুটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে। তাদের মধ্যে হিংসাত্মক দ্বন্দ্বে বহু জীবন হারিয়েছে। পরবর্তীতে, এই দুই বাহিনী নিজেরা ভাগ না করে একসঙ্গে আধিপত্য বিস্তার করে অন্যদের জন্য জমি ও ফসলের অধিকার হারানো হয়। এর ফলে, এই চরের পরিবেশ ছিল ভয়ঙ্কর ও অন্ধকারাচ্ছন্ন। সেই সময়ে, পান্না বাহিনী ও লালচাঁদ বাহিনী নামে দুটি শক্তিশালী গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের সময় ৪১ জনের মতো মানুষ খুন হয়। দৌলতপুরের এই চরে তখন জনসাধারনের জন্য ভয়ের কারণ ছিল। এই দুই বাহিনীর নেতার মধ্যে একজন ছিলেন ‘পান্না বাহিনী’র উচ্চপদস্থ নেতা কাকন।সূত্রের अनुसार, ২০২৩ সালের জুন থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত এই বাহিনীর বিরুদ্ধে মোট ছয়টি মামলা দায়ের হয়েছে। এই বাহিনীর প্রধান কাকন পাবনার ঈশ্বরদী শহরের বাসিন্দা হলেও তার পুরানো স্বজনরা থাকেন কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের মরিচা গ্রামে।১৯৯৪ সালে civil engineering বিষয়ে বিএসসি ডিগ্রি লাভের পর তিনি কিছুদিন চাকরি করলেও, ২০০৫ সালে পান্না হত্যাকাণ্ডের পর ২০০৭ সালে সৌদি আরব থেকে ফিরে এসে ক্ষমতাধর রাজনীতি ও স্থানীয় নেতাদের ছত্রছায়ায় বালুমহাল দখল ও নিয়ন্ত্রণ শুরু করেন। এরপর থেকে, তিনি নিজস্ব সন্ত্রাসী বাহিনী গঠন করেন। জানা গেছে, বর্তমানে তার বাহিনীতে প্রায় ৪০ জন সদস্য রয়েছেন। গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর, দৌলতপুরের ফিলিপনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নইম উদ্দিন সেন্টুকে নিজের অফিসে গুলি করে হত্যা করে এই বাহিনীর সদস্যরা। এই ঘটনার পর, টুকু বাহিনী বা তারেকুল ইসলামের নেতৃত্বে দলের আরো ২০ জনের বেশি সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা হয়। তবে, বেশিরভাগ আসামি আটক হলেও পরে জামিনে মুক্তি পান। এবছরের ১০ ফেব্রুয়ারি রাতে মরিচা ইউনিয়নের বৈরাগীরচর এলাকায় রাজু আহমেদ নামে এক যুবককে গুলি করে হত্যা করে সাইদ বাহিনী। এই বাহিনীর নেতা আবু সাঈদ মণ্ডল। তাঁর বিরুদ্ধে দৌলতপুর থানায় বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে। অন্যদিকে, ‘রাখি বাহিনী’র প্রধান রাকিবুল ইসলাম রাখির বিরুদ্ধে সাতটি মামলা রয়েছে। তাঁর বাড়ি ফিলিপনগর ইউনিয়নের দারোগার মোড়ে। এছাড়াও, রয়েছে কাইগি, রাজ্জাক ও বাহান্ন বাহিনী। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, ৫ আগস্টের পর দৌলতপুর সীমান্ত দিয়ে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র বাংলাদেশে প্রবেশের খবর রয়েছে। মোট প্রায় ২ হাজারের মতো আগ্নেয়াস্ত্র দেশে আসার খবর পাওয়া গেছে।এই দুর্গম চরে পুলিশি অভিযান চলছিল বৃহস্পতিবার। সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এই অভিযান চলাকালে পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। তবে স্থানীয়রা এই অভিযানে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন, তারা মনে করছেন যে, এই অভিযান থেকে বা অন্য কোনো স্থানে সন্ত্রাসী ও চোরাচালানীরা এখন আর এই এলাকা নিরাপদ নয়। কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়সাল মাহমুদ বলেন, ‘এই অভিযান রাতেও চলবে। এটি শেষ নয়। পুলিশ শুধু আক্রোশের জন্য নয়, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জন্য এই অভিযান চালাচ্ছে। এখনই ভয় ভেঙে যাওয়া যায় না, তবে শিগগিরই এই অন্ধকার দূর হবে।’