ঢাকা | সোমবার | ১৩ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩০শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | ২৫শে শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

পাকিস্তানে শান্তিচর্চা ব্যর্থ: ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের অচলাবস্থা ও বিশ্বজুড়ে ঝুঁকি

পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত এক দিনের মধ্যস্থতাবিহীন আলোচনা শেষ পর্যন্ত কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি। প্রায় ২১ ঘণ্টা চলা বৈঠকের পরই আলোচনার ব্যর্থতার কথা বলা হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়েই একে নিজেদের চাপে পরাজয় হিসেবে দেখছে। এই পরিণতির আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রভাব পড়বে বলে অনেকে সতর্ক করছে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের অবস্থা আবার উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।

বৈঠকের পর সাংবাদিকদের মাধ্যমে সিনেটর জে.ডি. ভ্যান্স জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন ইরানকে ‘চূড়ান্ত ও সর্বোত্তম প্রস্তাব’ দেওয়া হয়েছে এবং সে প্রস্তাবের পর আলোচনার টেবিল ছেড়ে যাচ্ছেন। তবে ইরানি সরকারি মিডিয়া এবং রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারে বলা হয়েছে, আলোচনায় ভেস্তে যাওয়ার দায় যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত দাবিতেই। ফলে দুইপক্ষ পরস্পরকে দোষারোপ করে ফিরেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এক সিরিজ সংঘর্ষের পর উত্তেজনা তীব্র হয়—যেখানে বিভিন্ন পক্ষের অন্তর্ভুক্তি ও পাল্টা হামলার দাবি তুলে পরিস্থিতি সামান্য উত্তপ্ত হওয়া নিয়ে আলাপ শুরুর প্রয়োজন দেখা দেয়। ইসলামাবাদে এই প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদল বসেছিল; এটি ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে উচ্চপর্যায়ের আলোচনার একটি।

তবে আলোচনা চলাকালীন কেন্দ্রীয় বিভেদ ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। ওয়াশিংটন ইরানকে স্পষ্ট ও যাচাইযোগ্যভাবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি দিতে বলেছিল; তেহরান তার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণকে স্বজাতীয় অধিকার হিসেবে প্রতিপন্ন করে তা সীমিত করতে অনীহা দেখায়। অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ইস্যুও জটিলতা বাড়িয়েছে—ইরান বিদেশে জব্দ থাকা সম্পদ মুক্তি এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি রাখে; যুক্তরাষ্ট্র ধাপে ধাপে অগ্রগতির কথা বললেও তাত্ক্ষণিক ছাড় দিতে অনাগ্রহী ছিল বলে অনেকে জানাচ্ছে।

আরও একটি শস্ত্রকেন্দ্রিক উদ্বেগ ছিল হরমুজ প্রণালি—বিশ্ববাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে নিরাপত্তা ও চলাচল নিশ্চিত করার ব্যাপারে দুপক্ষের অবস্থান পৃথক। যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক নৌচলাচল অবিচ্ছিন্ন রাখতে চায়, আর ইরান নিজের প্রভাব বজায় রাখতে আগ্রহী—এই দ্বন্দ্বও আলোচনায় বড় বিশৃঙ্খলার কারণ হয়েছে।

আলোচনার সময়ে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিতে মাইন অপসারণকারী জাহাজ মোতায়েন করার কথা জানিয়েছে। ইরানি মিডিয়ার অভিযোগ ছিল, যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত দাবি করায় আলোচনাটা এগোয়নি; সরকারিভাবে বলা হয়েছে ইরানি প্রতিনিধিদল ২১ ঘণ্টা ধরে দেশের স্বার্থ রক্ষায় ব্যাপক আলোচনা করেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, একদিনব্যাপী এই ম্যারাথন বৈঠকেই যে ফল দেখা গেল, তা হঠাৎ নয়—দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস, কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও জটিল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার ফলাফল। দ্য গার্ডিয়ান, আল জাজিরা, রয়টার্স ও দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের রিপোর্টগুলোও উল্লেখ করছে যে পারমাণবিক বিষয়, আর্থিক নিষেধাজ্ঞা ও নৌনিরাপত্তা—এই তিনটি মিলিয়ে ভারী মতানৈক্যের কারণে সমঝোতা কঠিন হয়ে উঠেছে।

এবার কী হবে—এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো উত্তর নেই। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তারা ইরানকে প্রস্তাবটি বিবেচনার সময় দিতে প্রস্তুত থাকতে পারে; আগে যুক্তরাষ্ট্র বলেছিল তারা ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয় করে দুই সপ্তাহ হামলার বিরতি রাখবে যাতে কূটনৈতিক পথ চালু থাকে। কিন্তু আলোচনার এই ব্যর্থতার ফলে লড়াই ফের বাড়ার সম্ভাবনা বেড়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মন্তব্য করছেন। বিবিসি সাংবাদিকদেরও ধারণা, নতুন অতিরিক্ত আক্রমণের ঘোষণা না আসলেও ঝুঁকি বেড়ে গেছে।

সর্বশেষে বলা যায়, ইসলামাবাদের বৈঠক কূটনীতির দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলেও কাঙ্গাল সমাধানে পৌঁছানো গেল না। এখন পরিস্থিতি অনিশ্চিত: কূটনৈতিক চেষ্টাগুলো স্থগিত না করে নতুন রাউন্ড বা বিকল্প মধ্যস্থতার সুযোগও হতে পারে, আবার সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিক চাপ বাড়লেও চিন্তার জায়গা রয়েছে। বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলোর পলিসি ও মধ্যপ্রাচ্যের জটিল বাস্তবতা মিলিয়ে পরবর্তী সময়টা নজরদারির দাবি রাখে।