ঢাকা | মঙ্গলবার | ২৪শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১১ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | ৭ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি

প্রতি ২০ মিনিটে একটি ধর্ষণ: অনুভব সিনহার ‘অসসি’ ভারতের কড়া বাস্তবতা উন্মোচন

সমালোচকপ্রশংসিত নির্মাতা অনুভব সিনহা তাঁর নতুন ছবি ‘অসসি’ নিয়ে দর্শকের সামনে ভারতের এক গভীর ও কষ্টকর বাস্তবতা তুলে ধরেছেন। ২০ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পাওয়া এই চলচ্চিত্রটি কেবল বিনোদন নয়—এটি নারী নিরাপত্তা, ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিচারব্যবস্থার দিকভ্রষ্টতা সম্পর্কে তীব্র প্রশ্ন তোলে। ছবির শিরোনাম ‘অসসি’ (আশি) দেশের প্রতিদিনের ধর্ষণের আনুমানিক সংখ্যার দিকে একটা মর্মস্থলগ্রাহী ইঙ্গিত।

চিত্রনাট্যের কেন্দ্রবিন্দু পরিমা নামের এক স্কুলশিক্ষিকা। দিল্লির নির্জন এক মেট্রো স্টেশন থেকে তাঁকে অপহরণ করে একটি যুবকদল; চলন্ত গাড়িতে চালানো হয় নির্মম ধর্ষণ। পরের সকালে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার হওয়ার পরে শুরু হয় পরিমার জীবন ও পরিবারের দীর্ঘ লড়াই—শারীরিক ও মানসিক পুনর্গঠন এবং ন্যায়প্রাপ্তির জন্য আইনি সংগ্রাম।

পরিমার পতি বিনয় (মোহাম্মদ জিশান আইয়ুব) স্ত্রীকে বাঁচানোর জন্য যে অটল সমর্থন দেখান, তা সিনেমার সংবেদনশীল ও শক্তিশালী অংশ হিসেবে উঠে আসে। তাঁর ভালোবাসা, ধৈর্য ও সহমর্মিতা পরিমার পুনরায় দাঁড়ানোর প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অপর দিকে, নির্যাতিতার পক্ষে আইনি লড়াইয়ে দাঁড়ানো অ্যাডভোকেট রাভি চরিত্রে তাপসী পান্নু দৃঢ়, প্রখর এবং বিশ্বাসযোগ্য অভিনয় করেছেন।

আদালত ও তদন্ত সংক্রান্ত দৃশ্যগুলোতে নির্মাতা সমাজব্যবস্থার এমন বিকৃত চিত্র ফুঁটে তুলেছেন যা দর্শককে অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। ধনবলে-শক্তিবলে কিভাবে মামলার গতি বদলে যায়, পুলিশি অনিয়ম কেমন করে অধিকারহীনদের কণ্ঠ নীর্ণ করে—এসবই ছবি নিখুঁতভাবে উপস্থাপন করে। মাঝে মাঝে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘প্রশ্ন’ কবিতার আক্ষেপ এবং আভাস দর্শকের অন্তরকেউড়ে ধরে।

কাহিনিতে নাটকীয় মোড় আনে এক অজানা ছাতাধারীর উপস্থিতি—এক ধাঁচের বিপর্যয়কর প্রতিশোধ নাকি ন্যায়ের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, তা সিনেমা জুড়ে রহস্য হিসেবে রাখা হয়েছে। এই অনিশ্চয়তা দর্শককে বারবার ভাবায় এবং গল্পকে তীক্ষ্ণ করে তোলে।

অভিনয় শৈলী ছবির আরেক শক্তি। তাপসী পান্নুর রাভি চরিত্র সংবেদনশীল ও শক্তিশালীভাবে উঠে এসেছে। কানি কুসরুতি পরিমার মানসিক কষ্ট ও যন্ত্রণা ফুটিয়ে তুলতে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেছেন। কুমুদ মিশ্রা ও মনোজ পাহওয়ার অভিনয়ও ছবিকে স্থিতিশীল করে। তথাপি কয়েকজন দর্শক মনে করছেন জিশান আইয়ুবের মতো শক্তিশালী অভিনেতার চরিত্র আরও বিস্তৃত হলে ছবির প্রভাব আরো বাড়ত। নাসিরুদ্দিন শাহর উপস্থিতি প্রশংসনীয়, তবে তাঁর চরিত্রটি কিছু অংশে অসম্পূর্ণ প্রতীয়মান হয়।

পরিচালক অনুভব সিনহা ও চিত্রনাট্যকার গৌরব সোলাঙ্কি বাস্তব ঘটনায় অনুপ্রাণিত হয়ে কাহিনি বুনেছেন—এখানে বার্তাটি স্পষ্ট: ঘরের ছোট-বড় শিক্ষা, নারীর প্রতি সম্মান ও সহমর্মিতা ছাড়া সমাজ সংবেদনশীল ও সুরক্ষিত হতে পারবে না। পুরো সিনেমা জুড়ে যে দাবিটি বারবার ধাক্কা দেয় তা হল—ভারতে প্রতি ২০ মিনিটে এক ধর্ষণের রূঢ় বাস্তবতা আমাদের সকলকে অচেতন করে তুলছে।

‘অসসি’ কেবল একটি চলচ্চিত্র নয়; এটি সমাজের অন্তরাত্মাকে নাড়িয়ে দেওয়া এক ডাক। ছবির শেষ কবোর্তায় রেখে দেয় এক অমীমাংসিত প্রশ্ন—নারীরা কি কখনো এই সমাজে নিরঙ্কुশভাবে, ভয়ে বঞ্চিত না হয়ে শান্তিতে বাঁচতে পারবে? সমস্যা যতই গভীর হোক, ‘অসসি’ দর্শককে ভাবতে বাধ্য করে এবং পরিবর্তনের আহ্বান জানায়।