প্রযুক্তি কোম্পানিদের ওপর শেয়ার বিক্রির জোরালো চাপের ফলে শুক্রবার এশিয়ার বড় বড় পুঁজিবাজারগুলোতে ভয়াবহ দরপতন ধরা পড়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তি (এআই) খাতে বিশাল বিনিয়োগের বিপরীতে লাভজনকতার উদ্বেগ এবং প্রযুক্তি পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা দ্রুত শেয়ার বিক্রি শুরু করলে এই অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান সূচক কোসপি লেনদেনের এক পর্যায়ে প্রায় ৮ শতাংশ পর্যন্ত পড়ে যাওয়ায় বাজারে তীব্র আতঙ্ক দেখা দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেখানে ‘সার্কিট ব্রেকার’ কার্যকর করে ২০ মিনিটের জন্য লেনদেন বন্ধ রাখা হয়—এটি চলতি সপ্তাহে তৃতীয় বার এবং এ বছর পঞ্চমবার। দিন শেষে কোসপি সূচক ৫ দশমিক ৮ শতাংশ পতনের মধ্য দিয়ে লেনদেন শেষ করে।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রযুক্তি শেয়ারগুলো সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক উত্থান দেখায় অনেক বিনিয়োগকারী এখন মুনাফা তুলছেন। পাশাপাশি কিছু বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের পণ্যের দাম বাড়ানোর ঘোষণাও ভোগান্তি বাড়িয়েছে। গত বৃহস্পতিবার অ্যাপল ও মাইক্রোসফট উভয়েই নির্দিষ্ট পণ্যের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিলে বাজারে আরও অস্থিরতা ছড়ায়। চিপ ও যন্ত্রাংশ উৎপাদনের খরচ বাড়ায় অ্যাপল তাদের আইপ্যাড ও ম্যাকবুকের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিলে কোম্পানিটির শেয়ারও বড় পরিমাণে পতিত হয়; একই সঙ্গে মাইক্রোসফটও এক্সবক্স গেমিং কনসোলের দাম বাড়ানোর পরিকল্পনা জানায়।
আলফা প্যাসিফিক গ্রুপের জ্যেষ্ঠ অংশীদার ডেভিড মাকারিয়ান বলেন, “গত কয়েক মাসে প্রযুক্তি খাতে যে উত্থান হয়েছিল, তার পরে অনেকই মুনাফা তুলে নিচ্ছে। এখন বিনিয়োগকারীরা কোম্পানিগুলোর বর্তমান মূল্যায়ন ও ভবিষ্যত আয় সম্পর্কে পুনঃমূল্যায়ন করছেন।” তিনি বলেন, যদিও দীর্ঘমেয়াদে এআইর সম্ভাবনা ভালই দেখা যাচ্ছে, তবু বাজার এখন অনেক বেশি সতর্ক।
জাপানের শেয়ারবাজারও বড় ধাক্কা খায়। নিক্কেই ২২5 সূচক ওইদিন চার শতাংশেরও বেশি পতিত হয়েছে। বিশেষত প্রযুক্তি বিনিয়োগকারী সফটব্যাংকের শেয়ার একদিনেই প্রায় ১২.৫ শতাংশ কমে গেছে। তাইওয়ান ও চীনের প্রধান সূচকগুলোতেও উল্লেখযোগ্য পতন দেখা গেছে।
কিয়োটো ইউনিভার্সিটি ইনোভেশন ক্যাপিটালের বিশ্লেষক রেমন্ড উ বলছেন, এআই অবকাঠামো তৈরি করতে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো বিশাল অঙ্কের খরচ করছে এবং সেই খরচ যদি সরাসরি ভোক্তার ওপর চাপানো হয়, তাহলে চাহিদায় ধীরগতি ঘটতে পারে। বড় প্রশ্নটি হলো, এই বিনিয়োগ তুলনায় ব্যবহারকারীর চাহিদা কতটা দ্রুত বাড়বে এবং দাম বাড়লে ডিভাইস বিক্রি কেমন থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্রেও একই ধকল লক্ষ করা গেছে—অ্যাপলের শেয়ার একদিনে প্রায় ৬ শতাংশ কমেছে। বিশ্বজুড়ে যন্ত্রাংশের মূল্যবৃদ্ধি ও প্রযুক্তি খাতে অতিরিক্ত বিনিয়োগের আশঙ্কা সম্মিলিতভাবে শেয়ারবাজারে নিম্নমুখী প্রবণতা সৃষ্টি করছে এবং এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সাময়সিক অস্হিরতা চলতেই পারে; আগামী কর্পোরেট রাজস্ব-প্রতিবেদন ও ভোক্তা চাহিদার প্রতিক্রিয়ার ওপর বাজারের ভবিষ্যৎ দিশা নির্ভর করবে। বিনিয়োগকারীদের জন্য এখন সতর্ক হওয়া এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ভিত্তি ও মূল্যায়ন মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করা হচ্ছে।








