নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার অজোপাড়া এলাকার নয়ামাটি ও পিরুলিয়া গ্রামে গড়ে উঠেছে ঐতিহ্যবাহী নৌকা গ্রাম, যা বর্ষার আগমনেই প্রাণ ফিরে পায়। এখানে বালু নদীর তীরে বসে ব্যতিক্রমধর্মী নৌকার হাট, যেখানে কাঠের খুটখাট শব্দ আর নদীর পানির ছলছল শব্দ মনকে আবেগে মজিয়ে রাখে। সেখানকার কারিগররা বর্ষাকালে অত্যন্ত ব্যস্ত থাকেন, কারণ এই সময়ে নৌকা তৈরি ও বিক্রির মৌসুম শুরু হয়। কায়েতপাড়া নৌকার হাটে এই সময়ে নৌকা বেচাকেনার ভিড় লক্ষণীয়, যদিও গোলাকান্দাইল ইউনিয়নের গোলাকান্দাইল বাজারেও প্রতি বৃহস্পতিবার নৌকার হাট বসে।
নৌকা তৈরির ইতিহাস বহু পুরনো; পিরুলিয়া ও নয়ামাটি এলাকার কারিগররা স্বাধীনতার আগে থেকেই নৌকা নির্মাণ করে আসছেন। অনেকের মতে এই ঐতিহ্য শতাব্দী প্রাচীন। পিরুলিয়ার বয়োজ্যেষ্ঠ অঞ্জনকুমার দাস জানান, তার পূর্বপুরুষরাই এই কারুকাজ শুরু করেন। পাশ্ববর্তী গোলাকান্দাইল ও সাওঘাট এলাকার কারিগররাও নৌকা তৈরি করে থাকেন।
নৌকা তৈরির কাজ প্রধানত হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা পরিচালনা করেন, যদিও আশির দশকের পর ব্যবসা কিছুটা কমে যায়। বর্তমান সময়ে প্রায় দেড়শ পরিবার নৌকা তৈরি করে টিকে আছেন। সাওঘাটের কারিগর প্রদ্যুত কুমার সরকার উল্লেখ করেন, কাটের ও লোহার দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় মুনাফা কমে গেছে।
সত্যেন দাস এবং রমেশ দাসের মত কারিগররা সাবলীল জীবন যাপন করছেন; তারা নৌকা বিক্রির মাধ্যমে সংসার চালাচ্ছেন এবং সন্তানদের ভাল শিক্ষাদান নিশ্চিত করছেন। তবে যান্ত্রিক নৌকা ও আধুনিক প্রযুক্তির আগমনে বাজারে কিছুটা প্রতিযোগিতা বেড়েছে, তবুও বর্ষার মৌসুমে নৌকা তৈরির কাজ জমে ওঠে। বিশেষ করে বন্যার বছরগুলো ব্যবসায় মন্দ পড়েনি বলে তারা জানান।
একটি নৌকা তৈরি করতে প্রায় ৮ থেকে ২০ হাজার টাকা খরচ হয় যা কাঠের ধরন ও আকারভেদে কম-বেশি হতে পারে। কায়েতপাড়া বাজারের বালু নদীর তীরে বর্ষাকালে নৌকার হাট জমে উঠে, যেখানে ঢাকার নিম্নাঞ্চল এবং আশপাশের এলাকা থেকে ক্রেতারা আসেন। গোলাকান্দাইলের নৌকার হাট প্রতি বৃহস্পতিবার প্রচুর সংখ্যক নৌকা বিক্রি হয়। এখানে একেকটি নৌকার দাম ৭ থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে হয়, আর নৌকার বৈঠাগুলো ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়।
স্থানীয় ব্যবসায়ী সুবল চন্দ্র দাস ও ক্রেতারা জানান, বর্ষার সময় নৌকার চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায় এবং এই বাজারে সস্তা ও ভাল মানের নৌকা পাওয়া যায়, যা ঢাকাসহ আশপাশের এলাকার মানুষের কাছে জনপ্রিয়। বর্ষার আগমনের সঙ্গে সঙ্গে নয়ামাটি ও পিরুলিয়া গ্রামে নৌকা তৈরির ঐতিহ্য ও ব্যবসায় নতুন প্রাণ ফুটে ওঠে, যা এখানকার মানুষের জীবিকা ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে টিকে আছে।







