চার বছরের সংঘাত ইউক্রেনের জনসংখ্যা ও সামাজিক গঠনকে তীব্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক বহুমুখী মানবিক সংকট — হাজার হাজার প্রাণহানি, গণবিলুপ্তি-আবদার ও নতুন প্রজন্মের জন্মহার কমে যাওয়া — যা দেশকে ধীরে ধীরে ‘বিধবা ও এতিমদের দেশ’ে পরিণত করার আশঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
শীর্ষস্থানীয় ডেমোগ্রাফার এলা লিবানোভা এই অবস্থাকে এক ‘মহা বিপর্যয়’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর কথায়, কোনো রাষ্ট্রই মানুষের ছাড়া টিকে থাকতে পারে না। যুদ্ধ শুরু থেকে ইউক্রেন প্রায় এক কোটি মানুষ হারিয়েছে — কেউ যুদ্ধে নিহত, কেউ নিরাপত্তার খোজে দেশ ছেড়েছে, আবার কেউ রুশ কর্তৃত্বে থাকা অঞ্চলে আটকে রয়েছেন। তরুণ ও কর্মক্ষম প্রজন্মের উল্লেখযোগ্য অংশের বিচ্ছিন্নতা জাতির ভবিষ্যতকে দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল করবে বলে তিনি সতর্ক করেন।
যুদ্ধ কেবল জীবনই বঞ্চিত করছে না; এটি প্রজনন সক্ষমতাকেও হুমকির মুখে ফেলছে। বহু নারী দীর্ঘ সময় রণাঙ্গনে বসবাসের কারণে সন্তানধারণের স্বাভাবিক সক্ষমতা হারিয়েছেন বলে জানায় চিকিৎসা পরিবেশ। কিয়েভের ‘নাদিয়া’ ক্লিনিকের পরিচালক ড. ভ্যালেরি জুকিন বলেন, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, অস্থির পরিবেশ ও দুর্যোগজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি প্রজনন ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তিনি উল্লেখ করেন গর্ভপাতের সংখ্যা বেড়েছে এবং ভ্রূণের জীনগত অস্বাভাবিকতা দেখা দিচ্ছে। পাশাপাশি, ফ্রন্টলাইন থেকে ফেরত পুরুষ সেনাদের শুক্রাণুর গুণগত মানও নিচে নামছে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
সরকারি তথ্য সবকিছু প্রকাশ করে না বলে মনে করা হলেও, মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (CSIS) জানায়, গত চার বছরে অন্তত ১ থেকে ১.৪০ লাখ সেনা নিহত হয়েছে। নিহতদের গড় বয়স ছিল প্রায় ৪৩ বছর; অর্থাৎ অধিকাংশই বিবাহিত ও পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। ফলত অনেক পরিবার এখন আর্থিক ও আবেগগত শূন্যতায় পড়েছে এবং হাজার হাজার নারী যুদ্ধবিধবা হয়েছেন।
একটি ব্যক্তিগত কাহিনী এই বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। আইরিনা ইভানোভারের স্বামী, এফ-১৬ পাইলট পাভলো ইভানোভ ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে নিহত হন। কয়েক মাস পরই জন্ম নেয় তাদের কন্যা ইউস্তিনা। সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা যায় বর্তমানে প্রায় ৫৯ হাজার শিশু তাদের জৈবিক মা-বাবা ছাড়াই বড় হচ্ছে — সংখ্যাটি জাতীয় প্রতিরোধ ও পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে গভীর মানবিক ও সামাজিক প্রভাব ফেলতে পারে।
২০২২ সাল থেকে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ বিদেশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছেন; তাদের মধ্যে বৃহৎ অংশই নারী ও শিশু। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই গণপ্রস্থান এক ধরনের ‘মেধা-উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া’—বিদেশে মানিয়ে নেওয়া বহু তরুণ ও দক্ষ জনশক্তির দেশে ফিরে আসার সম্ভাবনা কমে যাচ্ছে। যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের কাজ এখন আরও জটিল ও ব্যয়বহুল হবে।
তবু সবই নিঃসৃত না। ওলেনা বিলোজারস্কার-এর মতো কিছু মানুষের ব্যক্তিগত সফলতা আশা জাগায়। ৪৬ বছর বয়সে আধুনিক প্রযুক্তি ও চিকিৎসার সাহায্যে মায়ের ভূমিকায় ফিরেছেন তিনি; তাঁর নবজাতককে নাম রাখা হয়েছে ‘বোহদান’—ঈশ্বরের উপহার। এই ছোট ছোট নতুন প্রাণগুলোই অনেক ইউক্রেনিয়ানের কাছে দেশের টিকে থাকার প্রতীক ও নতুন শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
সংক্ষেপে, যুদ্ধ ইউক্রেনকে কেবল সামরিকভাবে নয়, সামাজিক ও জনসংখ্যাগতভাবে কঠিন চ্যালেঞ্জে ফেলেছে। যদি জন্মহার না বাড়ে, অভিবাসী অবস্থা কাটে না এবং ক্ষতিগ্রস্ত সেবা পুনরায় প্রতিষ্ঠা না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে দেশটি বিধবা ও এতিমের সমাজীয় রূপ নিতে পারে—এমনই আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। সময় ও নীতিগত উদ্যোগই নির্ধারণ করবে ইউক্রেন এই সংকট থেকে কীভাবে ফিরে আসে।




