ঢাকা | রবিবার | ৩০শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৫ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৭ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

রাখাইনে বিমান হামলায় টেকনাফ কেঁপে উঠল

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণশীল জায়গাগুলো পুনর্দখলের চেষ্টা হিসেবে দেশটির জান্তা বাহিনী বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে আটটার দিকে মংডু ও বুথিডং এলাকায় বিমান হামলা চালায়। একের পর এক বিস্ফোরণের বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে বাংলাদেশের টেকনাফসহ সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা, ফলে ছড়ায় ভীতি ও উদ্বেগ।

বাতাসে পড়া বোমার শব্দ সীমান্ত পেরিয়ে পৌঁছালে কক্সবাজারের আশ্রয়শিবিরগুলোও থমথমে হয়ে ওঠে। প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার বসতি হওয়ায় এখানে ফের উদ্বাস্তু ঢুকবার শঙ্কায় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি টহল জোরদার করে নাফ নদী ও স্থলসীমান্তে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়।

রোহিঙ্গা নেতা ছৈয়দ আলম বলেন, বাংলাদেশে এখনও সরাসরি মারামারি বা সংঘাত নেই, তবে আমরা তো ওপারের মানুষ—ওখানে লড়াই চালু হলে তার আতঙ্ক আমাদের মধ্যেই আসে। জান্তা সরকার নতুন করে রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতেও বিমান হামলা চালাচ্ছে বলেই উদ্বিগ্নতার কারণ বাড়ছে।

সীমান্তবর্তী গ্রামবাসীরা জানান, জাদিমুড়া থেকে শাহপরীরদ্বীপ পর্যন্ত বিস্ফোরণের শব্দ পরিষ্কারভাবে শোনা গেছে। আগুন ও ধোঁয়া দেখা যাওয়ার খবরও আসে, ফলে বহু পরিবার আতঙ্কে নিরাপদ স্থানের খোঁজ করতে শুরু করেছে। এর আগে বুধবার গভীর রাতে ভারী মর্টার শেলের বিস্ফোরণেও শিহরিত হয়ে উঠেছিল পুরো এলাকা।

মংডু উপজেলার খাওয়ার বিলের বাসিন্দা মোহাম্মদ আনোয়ার, যে ২০১৭ সালে পরিবার নিয়ে কক্সবাজারের টেকনাফে আশ্রয় নেয়, বলেন তিনি মুঠোফোনে জানতে পেরেছেন গৃহহানি ও হতাহতের খবর। অনোয়ারের স্বজনরা জানিয়েছেন, মংডু ও বুথিডংয়ে হামলায় অন্তত দুইজন রোহিঙ্গা মারা গেছেন এবং ২০-৩০টি ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে। এখনও সেখানে হাজারো রোহিঙ্গা বসবাস করেন এবং অনেকে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

টেকনাফ শাহপরীরদ্বীপের নাফ নদীসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা মো. নুরুল আবসার বলেন, ‘‘হঠাৎই এমন ভয়াবহ ঝাঁকুনি অনুভব করি—মনে হচ্ছিল গোটা জলভাগ কেঁপে উঠছে। প্রথম বিস্ফোরণের সময় নাফের ওপারে আগুনও দেখা গেছে। স্থানীয়রা মনে করছে এগুলো হয়ত আরাকান আর্মির ছোড়া মর্টার বা বিমান হামলার বিস্ফোরণ।’’

বিজিবি সীমান্তে সম্ভাব্য অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান রোধে জোরদার টহল চালাচ্ছে। টেকনাফ ২ বিওপির লেফটেন্যান্ট ফুয়াদ রহমানের নেতৃত্বে এলাকায় জল-স্থলপথে নৌ টহল এবং ড্রোন নজরদারি দেখা যায়। রামু সেক্টরের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘‘রাখাইনের কোনো সংঘাতকেই আমরা হালকাভাবে নেই না; পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ সতর্কতায় আছি।’’

পটভূমিতে রয়েছে ২০১৭ সালের নিধনযজ্ঞ থেকে রক্ষা পেয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেওয়া এক মিলিয়নেরও বেশি রোহিঙ্গা; তাদের পুনর্বাসন বা প্রত্যাবাসনে এখনও কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, রাখাইনে উত্তেজনা বাড়লে সীমান্তবর্তী বাংলাদেশি এলাকায় নতুন করে উদ্বাস্তু প্রবাহ ও নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জ দেখা দিতে পারে। সীমান্তবাসী এবং শিবিরের মানুষ এখন অনিশ্চয়তা ও ভয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন, আর প্রশাসন পরিস্থিতি মনিটর করছে।