রাঙ্গামাটির দুর্গম পাহাড়ে বিরল প্রজাতির গোলাপি রঙের নতুন হাতির বাচ্চা দেখা গিয়েছে, যা দেশে প্রথমবারের মতো নজরে এলো। বাচ্চাটির বয়স আনুমানিক দুই সপ্তাহের একটু বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জেলার বরকল উপজেলার সুভলংয়ের বরুনাছড়ি ইউনিয়নের বন সংরক্ষণ দলের এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমের (ইআরটি) প্রধান সমন্বয়কারী মো. জাহাঙ্গীর আলম এই তথ্য গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, দেশের প্রাণিজগতে এ ধরনের গোলাপি রঙের হাতির দেখা এখন পর্যন্ত কোনও ইতিহাস নেই, তাই এটি একটি বিস্ময়কর ঘটনা।
বরকল উপজেলার বরুনাছড়ির দুর্গম পাহাড়ে ইআরটিতে নিযুক্ত মো. জাহাঙ্গীর আলম নিজে প্রথমবার দেখতে পান একটি হাতির পাল, যেখানে রয়েছে গোলাপি রঙের একটি হাতির শাবক। তিনি সেই সময় ভিডিও ধারণ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের সাবেক বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিমকে পাঠান, ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি ব্যাপক জনসমক্ষে আসে।
বর্তমানে বরুনাছড়িতে মোট আটটি হাতি রয়েছে, যার মধ্যে নতুন জন্মানো গোলাপি বাচ্চাসহ পাঁচটি এক দলে রয়েছে। বাকি তিনটি অন্য তিনটি একত্রে অবস্থান করছে। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, সাধারণত হাতির বাচ্চার গায়ের লোম কালচে হলেও এই বিশেষ শাবকের গায়ের রং গোলাপি ধরনের এবং এটি একদম ব্যতিক্রমী।
রাঙ্গামাটি সার্কেলের বন সংরক্ষক মোহাম্মদ আবদুল আউয়াল সরকার গ্রামীণ ও বনাঞ্চলের কোয়ার্টার থেকে জানান, পাহাড়ে হাতি সংরক্ষণের জন্য বন বিভাগের পাশাপাশি একাধিক টিম কাজ করে যাচ্ছে। বন বিভাগের দপ্তর গত ১৩ জুন এই বিরল গোলাপি রঙের হাতির বাচ্চার খবর পাই এবং দ্রুত পরিদর্শনে যান। তিনি বলেন, বন বিভাগ সজাগ নজর রাখছে এ বিরল প্রাণীর দিকে।
গবেষকদের মতে, হাতির বাচ্চার গায়ের রং গোলাপি হওয়ার পেছনে নিউট্রিশনজনিত কারণ থাকতে পারে। জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও অধ্যাপক এম মনিরুল এইচ খান জানান, সাধারণত হাতির চামড়ায় থাকা রঞ্জক পদার্থে গোলাপি রং দেখা দিতেও জিনগত ত্রুটি বা অস্বাভাবিকতা ভূমিকা রাখতে পারে। এ ধরনের ঘটনা খুবই বিরল এবং এশীয় হাতিদের মধ্যে প্রায় দেখা যায় না। তিনি সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে এই বিরল প্রজাতির হাতির সঠিক সংরক্ষণে নিশ্চিত ভূমিকা পালনের পরামর্শ দিয়েছেন।
অধ্যাপক মনিরুল এইচ খান আরও বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের বনাঞ্চল ক্রমেই সংকুচিত হওয়ার ফলে হাতিদের আবাসস্থল হুমকির মুখে পড়েছে। বনাঞ্চলে মানুষের অনুপ্রবেশ বাড়ায় হাতি ও মানুষের মধ্যে সংঘর্ষও বাড়ছে, যা খুবই উদ্বেগজনক। এই অভয়ারণ্যের সুরক্ষায় সরকারি বনভূমি সংরক্ষণ এবং বন্যপ্রাণির প্রাকৃতিক বসবাসের জন্য পরিবেশ উন্নয়ন অপরিহার্য বলে তিনি মত দেন।
বর্তমানে পাহাড়ের নির্জন এলাকায় এ বিরল গোলাপি হাতি শাবক দেখতে দেশের নানা প্রান্ত থেকে গবেষক ও সাধারণ মানুষ আগ্রহ নিয়ে আসছেন। স্থানীয়রা জানান, নতুন জন্মানো এই শাবকটি মা হাতির শুড়ের ওপর থাকে এবং কাপ্তাই হ্রদের পাশ দিয়ে চলাচল করে।
তবে স্থানীয়রা সতর্ক করেছেন, দুর্গম এই অঞ্চলে মানুষের অনিয়ন্ত্রিত বিচরণ বন্ধ না করা গেলে দিকবদলের সুযোগে হাতি ও মানুষ দুজনেই বিপদে পড়তে পারেন। তাই এই বিরল প্রজাতির হাতির বাচ্চাসহ পুরো হাতির দলকে নিরাপদে রাখতে সরকারিভাবে এলাকা সংরক্ষণ জরুরি বলে মত প্রকাশ করেছেন তারা।









