ঢাকা | সোমবার | ১৩ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৯শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২৮শে মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

শ্রীমঙ্গল: ১৩৮ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৮১টিতে প্রধান শিক্ষক শূন্য, শিক্ষাব্যবস্থা প্রভাবিত

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর প্রধান শিক্ষক সংকট দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। উপজেলার মোট ১৩৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৮১টিতে নিয়মিত প্রধান শিক্ষক নেই, যা প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং পাঠদান উভয়কেই বিরূপভাবে প্রভাবিত করছে বলে শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্যে জানা যায়, ১৩৮টি বিদ্যালয়ের মধ্যে বর্তমানে ৫৭টিতে নিয়মিত প্রধান শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন; বাকি ৮১টি প্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য। এ শূন্যপদের মধ্যে ৩৫টি বিদ্যালয়ে জ্যেষ্ঠতা-সংক্রান্ত মামলার কারণে পদোন্নতি বা পদায়ন দীর্ঘদিন স্থगিত ছিল এবং অন্য ৪৬টিতে পদোন্নতি প্রক্রিয়া জটিলতা বা নতুন নিয়োগ না হওয়ায় শূন্যতা দেখা দিয়েছে।

প্রধান শিক্ষক না থাকায় অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দিতে হয়েছে। প্রশাসনিক কাজের চাপ বেড়ে যাওয়ায় তারা শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারছেন না। ফলে নিয়মিত পাঠদান বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং অন্যান্য শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত দায়িত্ব পরে শিক্ষার মানও খারাপ হচ্ছে।

সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে মাত্র তিন থেকে চারজন শিক্ষক দিয়েই পুরো শিক্ষা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। সেসব স্কুলে একজনকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দিতে হচ্ছে, ফলে দাপ্তরিক কাজ, প্রতিবেদন প্রস্তুত, সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়ন ও পাঠদানের মধ্যে ভারসাম্য রাখা দুষ্কর হয়ে উঠেছে। কোথাও কোথাও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে কেন্দ্র করে শিক্ষকদের মধ্যে মতপার্থক্যের ঘটনাও ঘটেছে।

বিদ্যালয়গুলোর ইতিহাসেও পার্থক্য আছে — উপজেলার ১৩৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬৬টি ১৯৭২ সালে জাতীয়করণ করা হয়েছিল, বাকিগুলো ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে জাতীয়কৃত হয়েছে। এই ভিন্ন ভিন্ন জাতীয়করণ ও পদোন্নতি প্রক্রিয়ার জটিলতা সংকটকে আরো জটিল করে তুলেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষকেরা বলছেন, ‘‘দীর্ঘদিন প্রধান শিক্ষক না থাকায় ভারপ্রাপ্তরা প্রশাসনিক কাজ সামলাতে গিয়ে শ্রেণিকক্ষে সময় দিতে পারছেন না। এতে পাঠদানে ঘাটতি হচ্ছে এবং সাধারণত যারা দায়িত্ব বণ্টন করেন তাদের ওপর চাপ পড়ে।’’

চাতালী চা-বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বিজয় নুনিয়া বলেন, ‘‘সরকারি বিধিমালা অনুসরণ করে আমাদের প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ করা হয়েছিল। পরে গেজেটে ভুলভাবে আমাদের নামের পাশে সহকারী শিক্ষক লেখা হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে মামলা হয় এবং আদালত আমাদের পক্ষে রায় দিয়েছেন। এটি প্রশাসনিক ত্রুটি; গেজেট সংশোধন করে আমাদের প্রধান শিক্ষক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য সরকারকে অনুরোধ করছি। আমরা দেড় যুগ ধরে বিদ্যালয় পরিচালনা করছি।’’

কয়েকজন অভিভাবকও জানান, শিক্ষক সংকটের কারণে তাদের সন্তানরা কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা পাচ্ছে না। অভিভাবক নারায়ণ, ইকবাল ও জয়কুমার বলেন, ‘‘শিক্ষার্থী সংখ্যার তুলনায় শিক্ষক সংখ্যা কম থাকায় অনেক স্কুলেই নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের ওপর অতিরিক্ত প্রশাসনিক কাজ থাকায় ছাত্র–ছাত্রীদের প্রয়োজনীয় মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয় না।’’

শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘‘উপজেলায় মোট ১৩৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। বর্তমানে ৫৭ জন নিয়মিত প্রধান শিক্ষক আছেন এবং ৪৬টি পদ শূন্য রয়েছে। এছাড়া জ্যেষ্ঠতা-সংক্রান্ত মামলার কারণে ৩৫টি বিদ্যালয়ে পদোন্নতি/পদায়ন স্থগিত ছিল।’’ তিনি আরো জানান, সম্প্রতি মামলার রায় হয়েছে; রায় বাস্তবায়িত হলে স্থগিত থাকা ৩৫টি প্রতিষ্ঠানে পদোন্নতি বা নতুন পদায়নের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং এতে দীর্ঘদিনের এই সংকট অনেকাংশে কমে বিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক ও শিক্ষা কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।

শিক্ষাব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে দ্রুত শূন্য পদে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষক পদায়ন জরুরি বলে অভিভাবক, শিক্ষক ও কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন।