ঢাকা | রবিবার | ২২শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৯ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | ৫ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি

সরবরাহ সংকট ও উত্তেজনায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামের বড় উল্লম্ফন

মধ্যপ্রাচ্যে বাড়তে থাকা সামরিক উত্তেজনা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পশ্চিমাদের সঙ্গে চলমান আলোচনার স্থবিরতার প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম সম্প্রতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েছে। আন্তর্জাতিক বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানায়, বৃহস্পতিবার লেনদেনের শুরুতেই ব্রেন্ট ফিউচার তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭০.৫৯ ডলারে এসে পৌঁছায়—এটি আগের দিনের তুলনায় ২৪ সেন্ট (০.৩%) বৃদ্ধি। একই সময়ে মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৬৫.৪৭ ডলারে ২৮ সেন্ট (০.৪%) বেড়েছে। উল্লেখ্য, গত বুধবারও তেলের দাম প্রায় ৪ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়ে জানুয়ারির ৩০ তারিখের পর উচ্চস্তরে পৌঁছে গিয়েছিল।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, মূলত ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের আশঙ্কাই বর্তমান অস্থিতিশীলতার প্রধান কারণ। বিশেষত হরমুজ প্রণালী—যা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—এতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহে বড় ধরনের ধাক্কা লেগে যেতে পারে। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু জলপথে বহন করা হয়; গত মঙ্গলবার ইরান কয়েক ঘণ্টার জন্য ওই প্রণালী বন্ধ রাখায় সরবরাহ চেইন নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়।

স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইরান তার সংবেদনশীল এলাকা ও সামরিক স্থাপনায় নতুন নির্মাণকাজ চালাচ্ছে এবং দখলদারি প্রযুক্তি ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের সম্ভাব্য প্রস্তুতি চলছে। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ওই অঞ্চলে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেছে, যা উত্তেজনা আরো বাড়িয়েছে। জেনেভায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পরোক্ষ আলোচনা থাকলেও নীতিগত বড় ফারাকের কারণে কোনো দ্রুত সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না; হোয়াইট হাউস জানিয়েছে তেহরান পরবর্তী রাউন্ডে বিস্তারিত তথ্য নিয়ে ফিরবে বলে আশা করা যাচ্ছে, কিন্তু বর্তমান অবিশ্বাসের পরিবেশ বাজারের অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে।

বাজার বিশ্লেষক নিসান সিকিউরিটিজের প্রধান কৌশলবিদ হিরোয়ুকি কিকুকাওয়া মনে করেন, সামগ্রিক উত্তেজনার মধ্যেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেলের মূল্য অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়াকে সমর্থন করবেন না, কারণ তা আমেরিকার অর্থনীতির জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাই যদিও সামরিক পদক্ষেপ হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও তা সম্ভবত সীমিত আকারের এবং স্বল্পকালীন হবে বলে তিনি আশাবাদী।

এর পাশাপাশি রাশিয়া-ইউক্রেন সংকটে আবার নতুন মোড় আসে, আর সাম্প্রতিক জেনেভা আলোচনা কোনো চূড়ান্ত সমাধি ছাড়াই শেষ হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা নতুন করে আশঙ্কায় পড়েছেন। এমন সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেলের মজুতও প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত কমে যাওয়ায় দাম বাড়ার আরো চাপ সৃষ্টি হয়েছে। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সপ্তাহের পূর্বাভাসে ক্রুড মজুত বাড়ার কথা থাকলেও পেট্রোল ও ডিস্টিলেট শ্রেণির মজুতে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে, যার চূড়ান্ত তথ্য জানতে ব্যবসায়ীরা এখন মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসন (ইআইএ)-র রিপোর্টের অপেক্ষায় রয়েছেন।

সরবরাহ ও চাহিদার এই অসামঞ্জস্য বিশ্ব অর্থনীতির সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ উত্থাপন করেছে। যদি হরমুজ প্রণালীতে স্থায়ী বা দীর্ঘস্থায়ী ব্যাঘাত হয়, তাতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে আরও তীব্র মূল্যচঞ্চলতা দেখা দিতে পারে—যা সব দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। বর্তমানে বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীরা রাজনৈতিক-প্রাতিষ্ঠানিক সংকেত ও ইআইএ রিপোর্টকে আরও কাছে থেকে পর্যবেক্ষণ করছে, যেগুলোর ওপর আগামী দিনগুলোতে তেলের দর নির্ধারণ বেশি নির্ভর করবে.