ইরান জানিয়েছে হরমুজ প্রণালি এখন তাদের পুরো নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে এবং এই পথ দিয়ে চলাচলের জন্য জাহাজগুলোকে ইরানি মুদ্রা রিয়ালে টোল পরিশোধ করতে হবে—এমন মন্তব্য করেছেন ইরানের পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার হাজি বাবায়ী। মেহের নিউজ এজেন্সির উদ্ধৃতিতে তিনি হরমুজকে তেহরানের জন্য একটি ‘রেড লাইন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, অর্থাৎ বিষয়টি তাদের জন্য আপাতত অপ্রত্যাহার্য সীমা।
পশ্চিম এশিয়ার কৌশলগত এই নৌপথ নিয়ে চলমান কূটনৈতিক আলোচনার প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানে আয়োজিত বৈঠকের পর যুক্তরাষ্ট্র থেকে একটি সংবাদ সম্মেলন হয়। সেখানে জেডি ভ্যান্স (যুক্তরাষ্ট্রের একজন সিনিয়র রাজনীতিবিদ) উপস্থিত ছিলেন, কিন্তু হরমুজ সম্পর্কিত কোনো স্পষ্ট মন্তব্য করা হয়নি—যদিও এই জলপথটি আলোচনার অন্যতম জটিল ও কেন্দ্রীয় ইস্যু ছিল। সূত্রগুলো বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যেকার চলমান শর্তসাপেক্ষ যুদ্ধবিরতির অন্যতম প্রধান শর্তই হল এই প্রণালিতে জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা।
বিশ্ব বাণিজ্যে হরমুজের গুরুত্ব অপরিসীম: বিশ্বজুড়ে উৎপাদিত কাঁচা তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশই এই সংকীর্ণ পথ দিয়েই পরিবহন হয়। ফলে এখানে যে কোনো নিয়ন্ত্রণ, অবরোধ বা বাধা দ্রুত বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে ঝঞ্জাট সৃষ্টি করতে পারে এবং বাজারে মূল্যস্ফীতি বাড়াতে পারে।
এদিকে, সাবেক যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সোশ্যাল প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোসিয়ালে একটি পোস্টে দাবি করেছেন যে হরমুজ ‘শীঘ্রই উন্মুক্ত’ হবে। একই সময়ে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে যে তাদের দুটি যুদ্ধজাহাজ—মাইন অপসারণ অভিযানের অংশ হিসেবে—হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। সেন্টকম বলেছে, ইউএসএস ফ্রাঙ্ক ই পিটারসন ও ইউএসএস মাইকেল মারফি প্রণালি অতিক্রম করে আরব উপসাগরে অভিযান চালিয়েছে এবং এটি তাদের বৃহত্তর অপারেশনের অংশ ছিল যাতে নিশ্চিত করা হয় যে আগের মাইন অপসারণ কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে কিনা।
তবে এসব দাবিকে সরাসরি নাকচ করেছে ইরান। ইরানের সামরিক উত্সগুলো বলেছে, হরমুজের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণই চূড়ান্ত কর্তৃত্ব এবং সেখানে যেকোনো সামরিক জাহাজের আনুমানিক প্রবেশ তাদের নজরে থাকবে। বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) সরকারি বার্তায় হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে কোনো সামরিক জাহাজ চলাচলের চেষ্টা করলে ‘কঠোর জবাব’ দেওয়া হবে।
গেলো এক মাসে হরমুজ প্রণালি দিয়ে অন্তত ১০০টি জাহাজ পেরিয়েছে—লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্সের এই হিসাবটি ওয়াল স্ট্রিট জার্নালও উদ্ধৃত করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক এক সঙ্গে কিছু জাহাজকে ওই পথ দিয়ে চলাচলের জন্য টোল হিসেবে একরকম অর্থ প্রদান করতে হচ্ছে এবং ওই টোলের পরিমাণ কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি জাহাজের জন্য সর্বাধিক ২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি দাঁড়াতে পারে। ব্রোকার ও জাহাজ মালিকদের ভাষ্য, ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দরকষাকষির মাধ্যমে অনান্য দেশের জাহাজগুলোকেও এই পথে ছাড়পত্র নিতে হচ্ছে। ফলে এই প্রভৃতি আয় ইরানের জন্য একটি বড় অর্থনৈতিক সুবিধা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আরও এক ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে কিছু সামরিক কর্মকাণ্ডের পর এই সংকীর্ণ প্রণালিটি অস্থায়ীভাবে সীমিত করা হয়েছিল—ফলশ্রুতিতে বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বাড়ার দেখা পেয়েছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের কাছে একটি শক্ত অবস্থান ও presión—এবং তারা এই সুবিধা ত্যাগ করার সম্ভাবনা কমই। অপরপক্ষে, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও সময় ও পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়েছে—কিছু মুহূর্তে হরমুজ ‘আমাদের প্রয়োজন নেই’ বলার মতো আপাতত নিরপেক্ষ মর্যাদা দাবি করা হচ্ছে, আবার অন্য কবে সেটি ‘খোলা রাখা’ই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বা কার্যত অস্ত্রোপচারের একটি শর্ত হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছে। এসব বিপরীতমুখী সংকেত কূটনৈতিক অচলাবস্থাকে বাড়াচ্ছে এবং ভবিষ্যৎ আলোচনায় স্থায়ী সমাধান হওয়া কঠিন করে তুলছে।
সংক্ষেপে বলা যায়, হরমুজ প্রণালি এখন কেবল একটি নৌপথ নয়—এটি কূটনৈতিক শক্তি, অর্থনৈতিক লাভ এবং সামরিক সংকেতের মিশ্র প্রতীক। যে পর্যন্ত এখানে স্থায়ীভাবে বিশ্বাসযোগ্য নিরাপত্তা ও সরকারি চুক্তি প্রতিষ্ঠা করা হবে না, ততক্ষণ বিশ্ব জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক পরিবহনে অনিশ্চয়তা বিরাজ করবে।








