ঢাকা | সোমবার | ১৬ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২রা চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | ২৭শে রমজান, ১৪৪৭ হিজরি

হরমুজ প্রণালীতে আটকা এমভি ‘বাংলার জয়যাত্রা’: ৩১ নাবিক, বিএসসি কূটনৈতিক সহায়তা চায়

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার মধ্যে হরমুজ প্রণালির আশপাশে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জাহাজ এমভি ‘বাংলার জয়যাত্রা’ প্রণালির কাছে আটকে পড়েছে। জাহাজটিতে বর্তমানে ৩১ জন বাংলাদেশি নাবিক রয়েছেন। বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি) পরিস্থিতি বিবেচনায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে কূটনৈতিক সহায়তা চেয়ে একটি চিঠি দিয়েছে, যা সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক নিশ্চিত করেছেন।

ঘটনার সূত্রপাত: সম্প্রতি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এবং তাতে ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়ার মধ্যেই পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালী একটি ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। এমভি বাংলার জয়যাত্রা গত ২ ফেব্রুয়ারি ভারত থেকে পণ্য নিয়ে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করে। কাতারের একটি বন্দরে স্টিল কয়েল বোঝাই করার পর তা জেবেল আলীতে যাওয়ার পথে নিরাপত্তা পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় নতুন বন্দরে পণ্য সরবরাহের পরিকল্পনা বাতিল করে জাহাজটি নিরাপদে ফেরার সিদ্ধান্ত নেয়।

জাহাজটিকে হরমুজ দিয়ে পাস করিয়ে মুম্বাই যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও নিরাপত্তা সতর্কতা পাওয়ার পর পণ্যের গন্তব্য পাল্টানো হয়। নাবিকদের বরাতে জানা যায়, ১২ মার্চ যখন জাহাজটি হরমুজ প্রবেশমুখ থেকে প্রায় ৬৬ নটিক্যাল মাইল দূরে পৌঁছায়, তখন ওই এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর আসে। একই সময়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কোস্ট গার্ড নিরাপত্তার স্বার্থে জাহাজটিকে সরিয়ে নিতে অনুরোধ করে। পরে জাহাজটি পূর্বের অবস্থানে ফিরে আসে এবং এখন শারজা উপকূলের বহির্নোঙর এলাকায় নোঙর করে আছে—যা জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্ল্যাটফর্ম ম্যারিটাইম ট্রাফিকের তথ্য নিশ্চিত করেছে।

জাহাজটির ক্যাপ্টেন মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির পর থেকে হরমুজ প্রণালী হয়ে নিয়মিত জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধের মতো। সেখানে কয়েকটি জাহাজে মিসাইল বা ড্রোন হামলার ঘটনা হয়েছে, ফলে এমন কঠোর নিরাপত্তা সতর্কতা এসেছে। বর্তমানে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য মুম্বাইই হলেও হরমুজ পথ বন্ধ থাকায় সেখানে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না—তাই শারজাহ নোঙরে অবস্থান করছি।

বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক জানান, জয়যাত্রার সব নাবিক সুস্থ আছে। জাহাজে খাদ্য, পানীয় ও জ্বালানি তেল পর্যাপ্ত পরিমাণে রয়েছে এবং তা কয়েক মাস পর্যন্ত চলার সক্ষমতা রাখে। নাবিকদের নিরাপত্তা ও মানসিক সচ্ছলতা বজায় রাখতে নিয়মিত পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, আপাতত জাহাজটি শারজার নোঙর এলাকায় রয়েছে এবং কাতার থেকে নতুন পণ্য বহনের বিষয়ে কৌশলগতভাবে আলোচনা চলছে।

ঘটনাটি ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও গুরুত্ব পাচ্ছে। ঢাকায় নিযুক্ত জালিল রাহিমী জাহানাবাদীর বরাতে বলা হয়েছে, যুদ্ধের পরিস্থিতি সত্ত্বেও ইরান বাংলাদেশের জ্বালানি পরিবহনে প্রয়োজন হলে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত রয়েছে। বাংলাদেশের জ্বালানি পরিস্থিতি বিবেচনায় ঢাকার উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনুরোধে বিষয়টি তেহরানের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় সমন্বয় করা হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে হরমুজ প্রণালী ও তার আশপাশে অন্তত ১৮টি বাণিজ্যিক জাহাজ বিভিন্ন ধরনের হামলার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে গত বৃহস্পতিবার দুবাই উপকূলের কাছে ‘সোর্স ব্লেসিং’ নামের একটি কনটেইনার জাহাজ ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত পেয়ে আগুনে জ্বলে ওঠে; তবে ওই জাহাজের নাবিকেরা প্রাণে বেঁচে গিয়েছেন। বর্তমানে পারস্য উপসাগরে প্রায় ১১০টিরও বেশি তেলবাহী ট্যাংকার এবং এক হাজারেরও বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ নিরাপদ পথে যাওয়ার অপেক্ষায় আছে।

বিশ্ব শিপিং কাউন্সিলের প্রধান নির্বাহী জো ক্রামেক বলছেন, পাল্লা বেভার সংঘাতে জড়িত না থাকলেও নাবিকেরা এখন অত্যন্ত অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছেন।

অবস্থা এখনও অস্থিতিশীল থাকা সত্ত্বেও বিএসসি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জাহাজ ও নাবিকদের নিরাপদভাবে নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক ও.Operation–সংক্রান্ত বিকল্প পরিকল্পনা চালু করেছে।