ঢাকা | শুক্রবার | ১লা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৮ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৪ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

৯৩ বছর বয়সী কাশেমের একমাত্র সঙ্গী কুপি বাতিই

তথ্যপ্রযুক্তির যুগে যেখানে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছে গেছে বিদ্যুৎ ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, সেখানে শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতী উপজেলার সদর ইউনিয়নের সারিকালীনগর গ্রামের নামাপাড়ায় এখনও কয়েকটি পরিবার বিদ্যুৎবিহীন অন্ধকারে দিন যাপন করছে। বিশেষ করে ৯৩ বছর বয়সী বৃদ্ধ আবুল কাশেম এবং তার সঙ্গে থাকা তিনটি পরিবার আজও কুপি বাতি ও হারিকেনের আলোতেই নির্জীব জীবন কাটাচ্ছেন। ২০২৫ সালের এই বাস্তবতা সত্যিই অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটাই তাদের দৈনন্দিন জীবন।

বছর ঘুরে বছর বহু সময় ধরে তারা বিদ্যুতের ভান্ডারে বঞ্চিত। ঘরে নেই একটি বৈদ্যুতিক বাল্ব, নেই সৌর প্যানেল, এমনকি চলাচলের উপযোগী রাস্তা পর্যন্ত তাদের অধীনে নেই। বর্ষাকালে ঘরের চারপাশ পানিতে তলিয়ে পড়ে আর জলাবদ্ধতার ভেতর কাটে দিনগুলো। বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যকর শৌচাগারের সুবিধাও তারা থেকে বঞ্চিত।

আবুল কাশেম কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, ‘৯৩ বছর বয়স আমার। মুক্তিযুদ্ধের আগে থেকেই এ স্থানেই বাস করছি, কিন্তু এখনও নিজের ঘরে বিদ্যুতের আলো দেখিনি। হারিকেনের আলোতেই চলে জীবন। রাস্তা না থাকার কারণে অন্যের জমির আইল দিয়ে চলাফেরা করতে হয়। আমার বড় ছেলে মারা গেছে, কিন্তু জমির সংকটের কারণে বাড়ির মেঝেতেই তাকে দাফন করতে হয়েছে। যেন বাস্তবতার কঠোর পরাশক্তি মানুষগুলোকে দূরে সরিয়ে রেখেছে, ছবি তুলে চলে যায়, তবু কেউ খোঁজ নেয় না।’

এই পরিবারের জমির সংকট এতটাই চরম যে মৃত্যুর পর মরদেহ দাফনের জন্যও কোনো স্পেস আর অবশিষ্ট নেই। বড় ছেলের মৃত্যুর পর ভেঙে পড়া ঘরের মেঝে খুঁড়ে তাকে সমাহিত করতে হয়েছে। এখন আর কবর দেওয়ার জন্য কোনো নিরাপদ স্থান অবশিষ্ট নেই। জীবনে যেমন আলো নেই তেমনই মৃত্যুতেও তাদের নিজস্ব কবরবিছানার নিশ্চয়তা নেই।

এই পরিবারে কেউই শিক্ষা লাভ করতে পারেনি। সবার জীবন অতিবাহিত হয় কুপি বাতির আলোর নিচে। রান্না, সেলাই এবং গৃহস্থালির যাবতীয় কাজ চলে কেরোসিনের আলোতে জ্বলবলপত একটা হারিকেনের মাধ্যমে। রাতে নিয়মিত হারিকেন পরিষ্কার করা, কেরোসিন ভরা ও ফুয়েলের রেশা বদলানো তাদের দৈনন্দিন কর্মসূচির অংশ, যা যেন পুরোনো গ্রামের জীবনযাত্রার এক অনিবার্য অংশ।

এই বিষয়ে ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশরাফুল আলম রাসেল বলেন, ‘এটি অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। দ্রুত খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে যাতে ওই পরিবারগুলো বিদ্যুৎ, রাস্তা ও পানির সুবিধা পায়। সংশ্লিষ্ট বিভাগকে বিষয়টি জানানো হয়েছে।’

অন্যদিকে, স্বেচ্ছাসেবী ও তরুণ সমাজও এই পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। ‘ব্লাডচাই’ এর প্রতিষ্ঠাতা শান্ত শিফাত বলেন, ‘আমরা যখন উন্নয়নের কথা বলি, তখন এমন একটা পরিবার বিদ্যুৎবিহীন অন্ধকারে বসবাস করছে, এটা কোনও অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয়। দ্রুত সেখানে বিদ্যুৎ ও মৌলিক সেবা পৌঁছে দিতে হবে।’

স্বেচ্ছাসেবী মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, ‘ওই পরিবার শুধু আলো থেকে নয়, বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারের থেকেও বঞ্চিত। এটি কেবল সামাজিক সমস্যা নয়, সরকারের হস্তক্ষেপেরও প্রয়োজন।’

স্থানীয় তরুণ শুভ বলেন, ‘শৈশব থেকে দেখছি ওই বাড়িতে কুপি বাতি জ্বলছে। বিদ্যুৎ সংযোগ নেওয়ার সামর্থ্যও নেই ওই বৃদ্ধের। আমরা চাই, এই অবহেলা অবিলম্বে বন্ধ হোক।’

একসময় গ্রামের জীবনের অবিচ্ছেদ্য এক অংশ ছিল কুপি বাতি ও হারিকেন। কিন্তু আজও নামাপাড়ার এই পরিবারগুলো সেই আলো আঁকড়ে বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। উন্নয়নের জোয়ার নিয়ে এগিয়ে যাওয়া ঝিনাইগাতীর বুকে এই নিভৃত অন্ধকার যেন সমাজের এক নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।