ঢাকা | বৃহস্পতিবার | ৩০শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৫ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৬ই সফর, ১৪৪৮ হিজরি

৯৩ বছর বয়সেও কুপি বাতিতেই ভরসা কাশেমের

তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে, যখন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও বিদ্যুৎ ও আধুনিক সুবিধা পৌঁছে গেছে, তবুও শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতী উপজেলার সদর ইউনিয়নের সারিকালীনগর গ্রামের নামাপাড়ায় কিছু মানুষ বিদ্যুৎবিহীন অন্ধকার জীবনযাপন করছেন। ৯৩ বছর বয়সী আবুল কাশেম এবং তার পরিবারের তিনটি পরিবার আজও কুপি বাতি ও হারিকেনের আলোয় দিন কাটাচ্ছেন। ২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে এ ঘটনা যেন এক অবিশ্বাস্য বাস্তবতা।

এই পরিবারগুলো বছরের পর বছর ধরে বিদ্যুৎ ছাড়াই জীবনযাপন করছে। ঘরে নেই একটি বৈদ্যুতিক বাতি, নেই সৌর প্যানেল, এমনকি চলাচলের জন্য কোনো পাকা রাস্তা নেই। বর্ষার সময় ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে যায়, দিন কাটে জলাবদ্ধতার মধ্যেই। বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার ব্যবস্থাও নাই তাদের।

আবুল কাশেম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “৯৩ বছর বয়স আমার। মুক্তিযুদ্ধের আগে থেকেই এইখানে আছি, কিন্তু এখনও নিজের ঘরে বিদ্যুতের আলো দেখিনি। হারিকেনেই চলছি। রাস্তা না থাকার কারণে অন্যের জমির মধ্য দিয়ে হাঁটতে হয়। আমার বড় ছেলে মারা গিয়েছে, কিন্তু জায়গা না থাকার কারণে ঘরের মেঝেতেই তাকে দাফন করেছি। মানুষ ছবি তুলে যায়, কিন্তু কেউ খোঁজ নেয় না।”

জমির সংকটে কুলাঙ্গার এই পরিবার মৃত্যুর পর মরদেহ দাফনের জন্যও জায়গা পাচ্ছে না। কাশেমের বড় ছেলের মৃত্যুর পর বেহাল দশার ভাঙা ঘরের মেঝে খুঁড়ে তাকে দাফন করতে হয়েছে। এখন আর তাদের ঘরবাড়ির আশেপাশে দাফনের স্থানও বাকি নেই। জীবনে যেমন আলো নেই, মৃত্যুতেও তাদের নেই নিজের কবরের নিশ্চয়তা।

এই পরিবারে কেউই শিক্ষা লাভ করেনি। ছোট-বড় সবাই কুপি বাতির আলোয় জীবন কাটায়। রান্নাবান্না, সেলাই ও গৃহস্থালির সকল কাজ চলে কেরোসিন জ্বালানো হারিকেনের আলোতে। রাতে নিয়ম করে হারিকেন পরিষ্কার করা, কেরোসিন ভর্তি ও রেশা বদলানোর কাজ করতে হয়–যা যেন কুড়ি বছরের পুরনো গ্রামীণ জীবনের প্রতিচ্ছবি।

ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশরাফুল আলম রাসেল বলেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে নেওয়া হচ্ছে এবং দ্রুত খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ওই পরিবারগুলো যাতে বিদ্যুৎ, রাস্তা ও পানির সুবিধা পায়, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের জানানো হয়েছে।”

অন্য দিকে, সেচ্ছাসেবী ও তরুণ সমাজও এই পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর আবেদন জানিয়েছেন। ‘ব্লাডচাই’-এর প্রতিষ্ঠাতা শান্ত শিফাত বলেন, “আমরা উন্নয়নের গল্প বলি, কিন্তু এমন একটি পরিবার এখনও বিদ্যুৎহীন অন্ধকারে বাস করছে—এটা মেনে নেওয়া যায় না। দ্রুত বিদ্যুৎ ও মৌলিক সুবিধা পৌঁছে দিতে হবে।”

স্বেচ্ছাসেবী মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, “ওই পরিবার কেবল আলো নয়, বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত। এটি এক সামাজিক সমস্যা নয়, সরকারি হস্তক্ষেপেরও দাবি রাখে।”

স্থানীয় তরুণ শুভ জানান, “শৈশব থেকেই দেখি ওই বাড়িতে কুপি বাতি জ্বলছে। বিদ্যুৎ সংযোগ নেওয়ার সামর্থ্যও নেই ওই বৃদ্ধের। আমরা চাই এই অবহেলা দ্রুত মুছে দেওয়া হোক।”

একসময় গ্রামের চিরচেনা দৃশ্য ছিল কুপি বাতি ও হারিকেনের আলো। অথচ আজ নামাপাড়ার এই পরিবারগুলো সেই অন্ধকার আলোতে জীবনযাপন করতে বাধ্য। উন্নয়নের ঢেউয়ের মাঝেও ঝিনাইগাতীর এই নিভৃত কোণায় টিকে থাকা মানুষগুলোর দুঃখদর্শন আমাদের মনে করিয়ে দেয় দেশের উন্নয়নে এখনও অনেক কাজ বাকি।