বরগুনা জেলায় ডেঙ্গু জ্বরের সংক্রমণ দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ১৯০০ ছাড়িয়ে গেছে, যখন মৃতের সংখ্যা এতোটাই উদ্বেগজনক, তখন আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেড়েই চলছে।
প্রতিদিন নতুন নতুন রোগী শনাক্ত হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বেড়িয়ে আসছে। বিশেষ করে বরগুনা সদর, আমতলী, পাথরঘাটা, বেতাগী, তালতলী এবং বামনা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ডেঙ্গু আক্রান্তের হার সবচেয়ে বেশি। বরগুনা সদর হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে রোগীদের ভিড় বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক জায়গায় রোগী রাখার বেড সংকট দেখা দিয়েছে।
বরগুনা জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, চলতি জুন মাসের প্রথম দুই সপ্তাহেই প্রায় ৫০০ জন নতুন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। যাদের বেশিরভাগ শহর এলাকার বাসিন্দা হলেও গ্রামীণ অঞ্চলেও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। আক্রান্তদের মধ্যে শিশু ও বয়স্কদের সংখ্যাই বেশি।
বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. তাজকিয়া সিদ্দিকা বলেন, “আমরা রোগীদের সুচিকিৎসা দিতে সর্বাত্মক চেষ্টা করছি, তবে প্রতিদিন যে হারে রোগী আসছে, তা সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। হাসপাতালের বেড সংকট, স্যালাইন ও ওষুধের ঘাটতি এবং প্রয়োজনীয় জনবলের অভাব পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে।” তিনি আরও বলেন, মশার কামড়ে রোগীরা পুনরায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকায় হাসপাতাল চত্বরেও মশা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি বরগুনা ইউনিটের স্বেচ্ছাসেবকরা জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য মাইকিং ও শৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করছেন।
জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আবুল ফাত্তাহ জানিয়েছেন, “ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি জরুরি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। জেলার প্রতিটি উপজেলায় মেডিকেল টিম তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য লিফলেট বিতরণ, মাইকিং এবং স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।” তিনি আরো গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন, শুধুমাত্র চিকিৎসা নয়, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সম্মিলিত সামাজিক উদ্যোগ জরুরি। নিয়মিত মশা নিধন কার্যক্রম ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব, তা না হলে অবনতির আশঙ্কা প্রবল।
বরগুনা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শফিউল আলম জানিয়েছেন, “ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসন প্রয়োজনীয় সব ধরণের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদগুলোরও মশক নিধনে আরও সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।”
তবে বরগুনা পৌরসভার অনেক নাগরিক অভিযোগ করেছেন, পৌরসভার মশা নিধন কার্যক্রম যথেষ্ট নয় এবং অধিকাংশ এলাকাতে এখনও মশার প্রজননস্থল পরিষ্কার হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় ব্যক্তি ও পারিবারিক সচেতনতা সবচেয়ে কার্যকর উপায়। ঘরের আশপাশে জমে থাকা পানি নিয়মিত ফেলে দেওয়া, ফুলের টব, ড্রাম, কনটেইনার, এসি ট্রে ইত্যাদি পরিষ্কার রাখা এবং দিনে-রাতে মশার কামড় থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মশারি ব্যবহার ও মশা নিধনের স্প্রে প্রয়োগ গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসকরা এইসব বিষয়ে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানিয়েছেন।







