ঢাকা | সোমবার | ১৬ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | ২৮শে শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

ফসল রক্ষায় কারেন্ট জালের ফাঁদে মরছে বহু পাখি

রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার চরাঞ্চল ও বিভিন্ন দিকে সবজি ক্ষেতগুলিতে পাখির উপদ্রব বন্ধ করতে কৃষকরা বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করছেন। তবে এর মধ্যে বেশ কিছু কৃষক কারেন্ট জাল ব্যবহার করে ফসল রক্ষা করার চেষ্টা করছেন, যা খুবই উদ্বেগজনক। এই পদ্ধতিতে নির্বিচারে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি জালে আটকা পড়ে মারা যাচ্ছে। পরিবেশবান্ধব প্রাকৃতিক উপাদান হওয়া সত্ত্বেও, এসব পাখি হত্যা নিয়ে কৃষকদের মধ্যে কোনো অসন্তুষ্টি বা দুশ্চিন্তা দেখা যাচ্ছে না। এই বিষয়ে পরিবেশকর্মীরা মনে করেন, জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এটি খুবই গুরুতর সমস্যা। যদিও এই পাখি হত্যা বন আইনের পরিপন্থী, তারপরও এ বিষয়ে কোনো কার্যত উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপজেলা চরমাঞ্চল ও আশপাশে বিভিন্ন জমিতে নানা ধরনের সবজির চাষ হয়। বিশেষ করে বেগুন ও টমেটো ক্ষেতে পাখির উপদ্রব কমাতে কৃষকরা নানা পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন—যেমন খুঁটি পুঁতে ফিতা টানা, টিনের ঢাকনাদি বাজানো, কাকতাড়ুয়া স্থাপন। এর বাইরে, কিছু কৃষক কারেন্ট জাল দিয়ে পুরো ক্ষেতটি ঢেকে দেন। এতে করে পোকামাকড় ও সবজি খাওয়া বক, শালিক, ঘুঘু, বাঁদুর, চড়ুইসহ নানা দেশের পাখি জালে আটকা পড়ে মারা যাচ্ছে।

দৌলতদিয়া ইউনিয়নের চরকর্ণশন এলাকার কৃষক মো. ওমর আলি বলেন, তিনি প্রায় ২ বিঘা জমিতে বেগুন চাষ করছেন। ফলনও দারুণ হয়েছে, কিন্তু পাখি বসে বসে নষ্ট করছে ফসল। অনেক সময় পাখি ঠেকাতে চেষ্টা করেও অনেক ক্ষতি হয়। অবশেষে বাধ্য হয়ে কারেন্ট জাল ব্যবহার করতে হয়, জালে পাখি আটকা পড়লেও তিনি তা মুক্ত করে দেন বলে দাবি করেন।

অন্য এক কৃষক, মোবারক খাঁ, বলেন, কিছু সবজি ক্ষেতে পাখি ক্ষতি করে থাকলেও অনেক ফসলের ক্ষতিকর পোকা পরিশোধ করে দিয়ে পাখি প্রকৃতি ও কৃষির জন্য উপকারী। তাই কারেন্ট জাল পদ্ধতি ব্যবহার না করে, ক্ষেতের চারপাশে খুঁটি পুঁতে ফিতা টানানো, বাতাসে ভনভন শব্দে পাখি ভয় পেতেই পারে। এভাবে পাখির উপদ্রব কমানো যেতে পারে।

আরেক কৃষক জানিয়েছেন, তিনওগাছের টমেটো চাষ করছেন। অনেক পাখি রাতে জালে আটকা পড়ে মারা গেছে, কিন্তু পাখিদের উপদ্রব কমাতে তিনি এ ব্যবস্থা নেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গোয়ালন্দ নদী এলাকায় মাছ শিকারি ও কৃষকরা পুরাতন কারেন্ট জাল সহজে সংগ্রহ করতে পারেন। এই জালের ব্যবহারে পাখি নিধন ঘটনাও বেড়েছে। দুর্ভাগ্যবশত, এই পদ্ধতিতে নিধন হয় বেশ কিছু প্রজাতির পাখি, যেমন দোয়েল, শালিক, বুলবুলি, পেঁচা, চড়ুই ও কবুতর। পাখিপ্রেমীরা মনে করেন, প্রশাসন ও বন বিভাগের স্রষ্টাহীনতা ঘটে যাচ্ছে, কারণ তারা তার খোঁজ নিচ্ছেন না। এতে বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও কৃষক নির্বিচারে এই ক্ষতিকর পদ্ধতি ব্যবহার করে আসছেন।

প্রাকৃতির বন্ধু পাখিরা ফসলের ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে ফসলের সবুজতা রক্ষা করে। তারা প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনেক পাখি যেমন শালিক, বোবেল, কবুতর, পেঁচা ফসলের ক্ষতি কমাতে সহায়তা করে। ফলে, পাখি নিধন এভাবে অব্যাহত থাকলে পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতি হবে।

উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মো. রায়হানুল হায়দার মন্তব্য করেন, অন্নের চাহিদা মেটানোর জন্য ফসল উৎপাদন অপরিহার্য। কিন্তু একই সঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করাটা গুরুত্বপূর্ণ। পাখিরা ফসলের ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করে। তাই এ ধরনের মারাত্মক উপায়ে পাখি নিধন উচিৎ নয়। তবে, অনেক কৃষক এ পদ্ধতি ব্যবহার করছেন, কারণ অন্য কোন বিকল্প দেখতে পান না। কৃষি বিভাগ এই বিষয়ে সচেতনতা ও নানা পরামর্শ দিয়ে চলছে।